স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প রেজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (RUTDP)।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৮১টি পৌরসভা ও ৬টি সিটি করপোরেশন।
প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর থেকেই এর তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. মঞ্জুর আলীর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, কনসালটেন্ট নিয়োগে অনিয়ম, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, আত্মীয়করণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, RUTDP প্রকল্পটি কার্যত মঞ্জুর আলী ও তার ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি পূর্বে এমজিএসপি প্রকল্পের ডিপিডি ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্প শেষে অবশিষ্ট থাকা প্রায় ২০ কোটি টাকা নতুন প্রকল্প প্রণয়নে ব্যবহারের কথা থাকলেও বিভিন্ন ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে সেই অর্থ আত্মসাৎ অভিযোগ উঠেছে।
যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
RUTDP প্রকল্পে আউটসোর্সিং, কনসালটেন্ট ফার্ম এবং ইন্ডিভিজুয়াল কনসালটেন্ট—এই তিন মাধ্যমে ব্যাপক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দিনাজপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী মনোয়ার হোসেন, পিডি অফিসের কম্পিউটার অপারেটর মনির হোসেন এবং ভাগ্নে মুশফিক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনবল সরবরাহ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, জনবল নিয়োগ প্রাপ্তিতে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সূত্র আরও জানায়, RUTDP-এর ডিপিডি-১ মফিজুর রহমানও এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
ডিপিপি অনুযায়ী কনসালটেন্সি খাতে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই খাতে অনিয়মের সুযোগ রেখে প্রকল্প কাঠামো তৈরি করা হয়েছে । প্রায় ২০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে ইফতিশা, একুয়া কনসালটেন্সি, ডেপকো এবং ডিপিএম নামের চারটি কনসালটেন্ট ফার্মকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আরও অভিযোগ, টেন্ডারে জমা দেওয়া সিভি অনুসরণ না করে প্রকল্প পরিচালক নিজেই বিভিন্ন পদে জনবল নির্বাচন করেন।
৮৭ AME সহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
PMU-এর পাঁচটি পদে এবং CMSU-এর ১০টি পদে সর্বোচ্চ অর্থ গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে।
এছাড়া কিছু পদ দীর্ঘদিন খালি রেখে তাদের বেতনের অর্থ ভাগাভাগির ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের দাবি, মঞ্জুর আলীর বাসার কাজের মেয়ে, দারোয়ান, বাবার দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং তার বিভিন্ন ফ্ল্যাট, প্লট ও জমির তত্ত্বাবধায়ক কর্মচারীদের প্রকল্পের বিভিন্ন পদে দেখিয়ে বেতন দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া RUTDP প্রকল্পের চারটি গাড়ি পিডি ও তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত ব্যবহার করতেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ব্যবহৃত ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৩-১৮৯২ নম্বরের গাড়িটি মঞ্জুর আলী ব্যবহার করতেন। তার স্ত্রী, প্রকল্পে কর্মরত সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আয়েশা নূরী ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-১০৮৪ নম্বরের পাজেরো স্পোর্টস গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া একটি গাড়ি তার মেয়ে এবং আরেকটি গাড়ি তার শ্যালিকার ব্যবহারে করতেন বলে সূত্রের দাবি।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের সর্বোচ্চ প্রায় ৬ লাখ টাকা বেতনের একটি কনসালটেন্ট পদ দীর্ঘদিন খালি রাখা হয়েছিল। ৯ অক্টোবর ”এলপিআর” এ যাওয়ার পর ওই পদে নিজেই যোগদানের পরিকল্পনা করেছিলেন মঞ্জুর আলী।
একইভাবে প্রকল্পের ডিপিডি-২ পদটিও দীর্ঘদিন শূন্য রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে মঞ্জুর আলীর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে। সূত্র জানায়, মধুমতি মডেল টাউনে প্রায় ১৫ কাঠা জমি, কলেজগেট এলাকায় তিনটি ফ্ল্যাট, সাভারের বনগাঁ ইউনিয়নের গান্ধারিয়া এলাকায় প্রায় ১০ বিঘা জমি, দিনাজপুর ও বিরলে কমপক্ষে ১০ একর জমি রয়েছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি টিটিএল কোভেনার মাধ্যমে মঞ্জুর আলী বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন অনেকে।
এছাড়া ৫ই আগস্ট প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর কর্মকাণ্ড নিয়ে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সময় স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরকে একক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ রয়েছে।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক আজিজুল হক স্বাক্ষরিত স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৫০১.০০৪.২৫-২০০/৩৮৫, এ উল্লেখিত অভিযোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা এর বিরুদ্ধে নিয়োগ,পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বিধায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের স্বার্থে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ মিয়ার কাছে বিভিন্ন রেকর্ড পত্র চেয়ে চিঠি প্রদান করেন। প্রয়োজনীয় রেকর্ড পত্র প্রাপ্তী সাপেক্ষে অনুসন্ধানের কার্যক্রম চলমান বলে সূত্র দাবি করেন।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অবসরের পর প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার জন্য সম্প্রতি একটি প্রভাবশালী মহল তদবির করছে।
একটি বিশেষ জেলার-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ও অ্যাবের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী এ বিষয়ে সক্রিয় থেকে অনেক দূর এগিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এছাড়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এর প্রক্রিয়ায় আরো দুই একজনের নাম শোনা যাচ্ছে।।তবে এ বিষয়ে জানার জন্য প্রকৌশলী মনজুর আলীর মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। তবে প্রকৌশলী মঞ্জুর আলী সংশ্লিষ্ট সূত্র অনৈতিক ও আর্থিক কেলেঙ্কারের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এম.জি.আর.নাছির মজুমদার, সম্পাদক : এস এম রফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ঠিকানা: সেঞ্চুরি সেন্টার: খ-২২৫, প্রগতি সরণি, মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১২।, ফোন নং : +৮৮-০২-৫৫০৫৫০৪৭ | মোবাইল নং: ০১৭১৬৩৭১২৮৬
www: dailybhor.com
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোর