রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের সংযোগস্থলে কর্ণফুলী নদীর চন্দ্রঘোনা-রাইখালী ফেরিঘাট এলাকায় দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল-স্টেইড সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩২ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মিত হলে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের ফেরি-নির্ভর যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে। ২০৩১ সালের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্ণফুলী নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতুটি রাঙামাটির কাপ্তাই ও চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সংযোগস্থলে নির্মাণ করা হবে। আধুনিক এ সেতুতে উঁচু পাইলন থেকে টানা শক্তিশালী ইস্পাতের তারের মাধ্যমে মূল কাঠামোর ভার বহন করা হবে। সেতুটির সঙ্গে ৪৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট এবং ১ হাজার ২৫০ মিটারের বেশি দীর্ঘ উড়াল সড়কও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটির সঙ্গে রাজস্থলী ও বান্দরবান জেলার যোগাযোগ সহজ করতে ১৯৮৯ সালে রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী নদীতে ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। প্রায় ৩৭ বছর পরও একটি ফেরির মাধ্যমে দুই পাড়ের যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। পন্টুনের সমস্যা, ডুবোচর ও নদীর তীব্র স্রোতের কারণে প্রায়ই ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে যাত্রী ও চালকদের দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সওজ রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বাসসকে বলেন, স্টিল ও কংক্রিটের সমন্বয়ে নির্মিতব্য সেতুটির মূল অংশের দৈর্ঘ্য হবে ৫৩২ মিটার। চার লেনের সেতুটিতে আধুনিক ‘ব্রিজ স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’ যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে সেতুর অবস্থা ও স্থায়িত্ব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া থাকবে স্বয়ংক্রিয় টোল প্লাজা।
ক্যাবল-স্টেইড সেতুর কাঠামো সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ধরনের সেতুতে সড়কপথের ভার মূল টাওয়ার বা পিলারের সঙ্গে যুক্ত তির্যক তারের মাধ্যমে বহন করা হয়। শক্তিশালী ইস্পাতের তার দিয়ে সেতুর চলাচলের পথ টাওয়ারের সঙ্গে যুক্ত থাকে। টাওয়ার, তার ও সেতুর ডেক একসঙ্গে ভার বহন করায় নদীর মাঝখানে পিলার নির্মাণের প্রয়োজন হয় না। এতে দীর্ঘ স্প্যান তৈরি করা সম্ভব হয় এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচলে বাধা কমে।

সবুজ চাকমা জানান, রাঙামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর-১৬১) ২১তম কিলোমিটারে সেতুটি নির্মাণ করা হবে। এ জন্য ৭ দশমিক ৫২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, সেতুর চূড়ান্ত নকশা তৈরি করে প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন ডিপিপি পুনর্গঠন করে আবার পাঠাতে হবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
বর্তমানে চন্দ্রঘোনা ফেরিতে একবারে মাত্র ৮ থেকে ১০টি ট্রাক বা বাস এবং ১৫ থেকে ২০টি ছোট ও হালকা যানবাহন পারাপার করা যায়। একবার নদী পার হতে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগে বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।
কর্ণফুলী নদীতে স্রোত বেড়ে গেলে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের গেট খুলে দিলে কিংবা নদীতে পানির পরিমাণ কমে গেলে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয় এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সেতুটি চালু হলে ফেরি পারাপারের দীর্ঘ অপেক্ষা কমবে। পাশাপাশি পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রসার, কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ করা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হবে।
চন্দ্রঘোনার ব্যবসায়ী ফরিদ আহমদ বলেন, প্রতিদিন চন্দ্রঘোনা ফেরি দিয়ে প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার ছোট-বড় যানবাহন পারাপার হয়। কিন্তু ফেরির কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট সাম্পানে নদী পার হন।
তিনি বলেন, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার কয়েক লাখ মানুষ এ ফেরির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও তিন পার্বত্য জেলা ঘুরে কক্সবাজার যাওয়ার এ পথটি জনপ্রিয়।
কাপ্তাইয়ের রাইখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা থোয়াই অং মারমা বলেন, ফেরি অচল থাকলে তাঁদেরও চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুই-তিন মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় লাগে। জরুরি রোগীদের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে হয়। রাতেও অ্যাম্বুলেন্সকে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সেতু নির্মিত হলে কয়েক মিনিটেই নদী পার হওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
রাইখালী বাজারের ব্যবসায়ী তনয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফেরির সমস্যার কারণে পাহাড়ি এলাকার কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো যায় না। কখনো ফেরি বিকল হয়ে মাঝনদীতে আটকে পড়ে। সেতু নির্মিত হলে বান্দরবান ও রাঙামাটির সঙ্গে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
ট্রাকচালক রহিম উদ্দিন জানান, প্রতিদিন ইট পরিবহনের কাজে তাঁকে এ ফেরি ব্যবহার করতে হয়। কখনো এক ঘণ্টায় নদী পার হওয়া যায়, আবার কখনো দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকতে হয়। সেতুটি নির্মিত হলে সময়ের অপচয় ও জীবনের ঝুঁকি—দুটিই কমবে বলে তিনি আশা করেন।
সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমা বলেন, সেতুটি যাতায়াত সহজ করার পাশাপাশি রাঙামাটি ও বান্দরবানের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দুই পার্বত্য জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি মনে করেন।
কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, চন্দ্রঘোনায় সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং দুই জেলার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।
রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাস্টার খলিলুর রহমান শেখ বলেন, সেতুটি নির্মিত হলে পার্বত্য বান্দরবান, রাজস্থলী, চন্দ্রঘোনা, রাইখালী, রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাই এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে এবং তাঁদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এম.জি.আর.নাছির মজুমদার, সম্পাদক : এস এম রফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ঠিকানা: সেঞ্চুরি সেন্টার: খ-২২৫, প্রগতি সরণি, মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১২।, ফোন নং : +৮৮-০২-৫৫০৫৫০৪৭ | মোবাইল নং: ০১৭১৬৩৭১২৮৬
www: dailybhor.com
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোর