কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে শুধু পুলিশি অভিযান ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়; অপরাধের নেপথ্যের হোতাদের শনাক্ত করার পাশাপাশি পারিবারিক নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা এবং ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের পুনর্বাসনে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগেই এ সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব।
ঢাকা, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ (বাসস): আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় ১৫৯টি এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি নেপথ্যের হোতা, মদদদাতা, আশ্রয়দাতা এবং মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক দূরত্ব, শিক্ষাজীবনে অনিয়ম, অবসর সময় ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগের অভাব এবং অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের প্রভাব কিশোরদের অপরাধী চক্রে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগেই ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের শনাক্ত করে সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বাসসকে বলেন, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, পারিবারিক কলহ, শিক্ষাজীবনে অনিয়ম এবং অবসর সময় ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের সুযোগ না থাকা কিশোরদের অপরাধী চক্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি কেন গুরুত্বপূর্ণ
রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, আগে যৌথ পরিবারে পরিবারের অন্য সদস্যরাও শিশু-কিশোরদের দেখাশোনা করতেন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সেই নজরদারি কমে গেছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, পারিবারিক কলহ, বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি, স্কুল থেকে পালানো কিংবা ঝরে পড়া এবং অবসর সময় কাজে লাগানোর সুযোগের অভাব কিশোরদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, এলাকার বড়দের অনুসরণ, আড্ডা, মোটরসাইকেল নিয়ে ঘোরাফেরা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে কিশোরদের মধ্যে দলীয় সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। পরবর্তী সময়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব সম্পর্কের সঙ্গে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি ও অস্ত্র বহনের মতো অপরাধ যুক্ত হয়।
তাঁর মতে, স্থানীয় অপরাধীরা অনেক সময় কিশোরদের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করে। বয়স কম হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও সামাজিক চাপ তুলনামূলক কম হবে—এমন ধারণা থেকেও কেউ কেউ কিশোরদের অপরাধে সম্পৃক্ত করে।
এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের শনাক্ত করে কাউন্সেলিং, শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার ওপরও গুরুত্ব দেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।
স্মার্টফোন ব্যবহারে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। সন্তান নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনা করছে কি না, কার সঙ্গে মিশছে এবং তার আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।
সন্তান মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে পড়ছে কি না, বিদ্যালয়ের বাইরে কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং অনলাইনে কী ধরনের বিষয়বস্তু দেখছে, সেদিকেও অভিভাবক ও শিক্ষকদের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
স্মার্টফোন ব্যবহারের বিষয়ে অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, শিশু-কিশোরদের স্মার্টফোন দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্ক থাকা উচিত। তাঁর মতে, অন্তত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বয়সী সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে। তবে কর্মজীবী বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনে ছোট বাটন ফোনের বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অনেক শিশু-কিশোর খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করে। রাতে ঘুমানোর সময়ও ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের প্রবণতা তাদের দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
কিশোরদের মানসিক বিকাশে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চার ওপর গুরুত্ব দেন এই সমাজবিজ্ঞানী। তাঁর মতে, শুধু আইনের কঠোরতা দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়; কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, কিশোরদের পোশাক, চুলের ধরন কিংবা দলবদ্ধভাবে চলাফেরাকে এককভাবে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং তাদের আচরণগত পরিবর্তন, শিক্ষাজীবনের পরিস্থিতি ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে দায়িত্বশীলভাবে সহায়তা দিতে হবে।
অপরাধের নেটওয়ার্ক ভাঙতে অভিযান জোরদার
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বাসসকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা ধরে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সদস্যদের পাশাপাশি মূল হোতা, মদদদাতা, আশ্রয়দাতা এবং মাদক ও অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, গোয়েন্দা তথ্য, অপরাধের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা এবং প্রাপ্ত আইনগত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, বসিলা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীসহ আরও কয়েকটি এলাকায় এসব গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি সাম্প্রতিক তালিকার বরাতে তিনি জানান, মিরপুর বিভাগে ৩২টি এবং তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে। থানা হিসেবে পল্লবীতে ১৪টি এবং মোহাম্মদপুরে ১৬টি গ্রুপের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব গ্রুপের অবস্থান ও সক্রিয়তার চিত্র পরিবর্তনশীল।
তিনি বলেন, কেবল গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো নয়, অপরাধের মূল কারণ ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে পুনরায় অপরাধ সংঘটনের সুযোগ বন্ধ করাই এসব অভিযানের লক্ষ্য।
রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ১ হাজার ২১৯ সদস্যের তথ্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বাসসকে বলেন, হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারে রাজধানীতে নিয়মিত অভিযান চলছে। অনেককে গ্রেপ্তার করে মামলা দায়েরসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ১ হাজার ২১৯ জন সদস্যের তথ্য রয়েছে। তাঁদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছর। এসব অপরাধীকে গ্রেপ্তারে স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট (এসআরইউ) ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কাজ করছে।
এডিশনাল আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. সায়েদুর রহমান বাসসকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য কিংবা তাদের পেছনে থাকা আশ্রয়দাতাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মূল লক্ষ্য শুধু গ্রেপ্তার নয়, কিশোরদের বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিট পুলিশিং, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনে গুরুত্ব
কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লায় পুলিশি নজরদারি জোরদার, চিহ্নিত স্থানে নিয়মিত তল্লাশি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ টহল পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া ও তাদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক আলোচনা, অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের বয়স, অপরাধের ধরন, সংশ্লিষ্টতার মাত্রা ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র, কাউন্সেলিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
অপরাধে জড়িত কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ থেকে ফিরে আসতে আগ্রহী কিশোরদের পুনর্বাসনের সুযোগ রাখতে হবে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, মানসিক সহায়তা দেওয়া, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাদের অবসর সময় ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটির সমন্বিত ভূমিকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একদিকে অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও নেপথ্যের মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে, অন্যদিকে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো দূর করতে হবে। পারিবারিক নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং পুনর্বাসনমূলক সহায়তা একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে এ সমস্যা মোকাবিলায় অগ্রগতি সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। আইন প্রয়োগ, অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ভূমিকার সমন্বয় দীর্ঘমেয়াদে কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এম.জি.আর.নাছির মজুমদার, সম্পাদক : এস এম রফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ঠিকানা: সেঞ্চুরি সেন্টার: খ-২২৫, প্রগতি সরণি, মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১২।, ফোন নং : +৮৮-০২-৫৫০৫৫০৪৭ | মোবাইল নং: ০১৭১৬৩৭১২৮৬
www: dailybhor.com
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোর