স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়িয়েছে জাতিসংঘ। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ। গত ২৯ অক্টোবর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। সরকারের দীর্ঘ এক বছরের সমন্বিত উদ্যোগ, অর্থনৈতিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা এবং ব্যবসায়ী মহলের সহযোগিতায় এ অর্জন এসেছে।
এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এলডিসি উত্তরণ ঘিরে দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি বাণিজ্য ও শিল্প খাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য অতিরিক্ত সময় পেল সরকার। তবে এই সময়কে কাজে লাগিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে। বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকেরাও আগাম উত্তরণের ফলে বাজারসুবিধা হারানো, রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরেন।
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় উদ্যোগ
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ শুরু হয় গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম কর্মদিবসেই বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সময় বাড়ানোর আবেদন করার সিদ্ধান্ত জানান। একই দিন ইআরডি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে চিঠি পাঠিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়।
সরকারের যুক্তি ছিল, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জের কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা কঠিন। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, কাঠামোগত সংস্কার এবং মসৃণ উত্তরণ কৌশলের অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা
প্রস্তাবটির পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। মার্চে ক্যামেরুনের ইয়াউন্ডেতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন তিনি। সম্মেলনের সাইডলাইনে ২৮ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্যবিষয়ক কমিশনার মারোস সেফকোভিচের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন চান।
এপ্রিল মাসেও এ বিষয়ে তৎপরতা অব্যাহত থাকে। ৫ এপ্রিল জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। পরদিন ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে সমর্থন কামনা করেন।
২৬ এপ্রিল সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেংগলির সঙ্গেও বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়।
সিডিপির ইতিবাচক মনোভাব ও ব্যবসায়ীদের ভূমিকা
এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে ২৯ এপ্রিল। ওই দিন জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) সঙ্গে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদলের ভার্চুয়াল পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে এতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগের কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বাজারসুবিধা হারানোর আশঙ্কা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অভাব, রপ্তানি প্রতিযোগিতা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন।
এসব বিষয় পর্যালোচনার পর ১ জুন ইআরডি সচিবকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের আবেদনের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানায় সিডিপি। পরদিন ইআরডি এক বিবৃতিতে বিষয়টি প্রকাশ করে।
নেপালের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, জি-৭৭-এর সমর্থন
বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর প্রস্তাবকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী করতে নেপালের সঙ্গেও যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়। নেপালের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনায় দুই দেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, গ্রুপ অব ৭৭ (জি-৭৭) জোটের সঙ্গে অনলাইন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বিস্তারিত উপস্থাপনা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এর পর বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জোটটি।
জুলাই মাসে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) পর্যায়েও বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়। ২১ জুলাই ইকোসক সর্বসম্মতিক্রমে একটি সুপারিশ গ্রহণ করে। এতে বাংলাদেশ ও নেপালের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের বিষয়ে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এর মধ্য দিয়ে সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটির চূড়ান্ত বিবেচনার পথ সুগম হয়।
অতিরিক্ত সময়ের সদ্ব্যবহারই এখন মূল লক্ষ্য
সময় বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়টিও সামনে আনে সরকার। জুলাইয়ে আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার ওপর গুরুত্ব দেন।
অক্টোবরেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমর্থন আদায়ের তৎপরতা অব্যাহত থাকে। ১৯ অক্টোবর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) যৌথ সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বর্ধিত সময় কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে সরকার সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অবশেষে ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশ ও নেপালের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব গৃহীত হয়।
এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জন। তবে সময় বাড়ানোই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। বরং ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করে রপ্তানি বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপযোগী অর্থনীতি গড়ে তোলাই হবে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এম.জি.আর.নাছির মজুমদার, সম্পাদক : এস এম রফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ঠিকানা: সেঞ্চুরি সেন্টার: খ-২২৫, প্রগতি সরণি, মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১২।, ফোন নং : +৮৮-০২-৫৫০৫৫০৪৭ | মোবাইল নং: ০১৭১৬৩৭১২৮৬
www: dailybhor.com
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোর