প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ১৪, ২০২৬, ১২:৩৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ আগস্ট ১৩, ২০২৬, ৯:৫৯ অপরাহ্ণ

রূপালি মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে আগামী রবিবার (১৬ আগস্ট) থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬। মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সাফল্য, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদন, জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এবারের আয়োজন। এবার জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষ্যে ১৩টি ক্যাটাগরিতে ১৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণপদক) দেওয়া হবে।
আজ ঢাকায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, জাতীয় মৎস্য পক্ষের কেন্দ্রীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের জর্জ ইনস্টিটিউট মিনি স্টেডিয়াম মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধন ঘোষণা এবং পদক বিতরণ করবেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিতে মৎস্যখাতের অবদান দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ মৎস্যখাতের সঙ্গে যুক্ত, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীও রয়েছেন। এ খাতের প্রবৃদ্ধির হারও সন্তোষজনক। তিনি আরো বলেন, মৎস্যখাত বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সরকারের দূরদর্শী নীতি, গবেষণা ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ খাতকে আরো আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই পর্যায়ে উন্নীত করার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
মন্ত্রী আরো বলেন, দেশে মাছের প্রাপ্যতার ক্ষেত্রেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বর্তমানে মাথাপিছু দৈনিক মাছের প্রাপ্যতা ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রাম, যেখানে জাতীয় পুষ্টিচাহিদা নির্ধারিত ৬০ গ্রাম। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় মাছের প্রাপ্যতা ইতোমধ্যে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৫১ দশমিক ১১ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। মৎস্যজীবী, মৎস্যচাষি, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
আমিন উর রশিদ বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের মৎস্য খাতের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) ‘The State of World Fisheries and Aquaculture 2026’ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম, তেলাপিয়া উৎপাদনে অষ্টম, ক্রাস্টেশিয়ান আহরণে ষষ্ঠ এবং উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। এসব অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরে হয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৮ লাখ ১১ হাজার ৫৫২ জন। এর মধ্যে ইলিশ আহরণকারী ৬ লাখ ৫০ হাজার ২৫১ জন, হাওরাঞ্চলের ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৮ জন এবং সমুদ্রগামী জেলে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২১১ জন।তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব নয়। এ জন্য নিষেধাজ্ঞাকালে জেলেদের বিকল্প খাদ্য ও আয়ের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষিদ্ধ মৌসুমে ৪০ হাজার ইলিশ জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে ১৫ হাজার ৫০৩ দশমিক ৫০১ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল, জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় চার মাসে ৫৮ হাজার ৭২০ দশমিক ১৬১ মেট্রিক টন চাল, সমুদ্রে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে ২৪ হাজার ১৬৫ দশমিক ৬২৫ মেট্রিক টন চাল এবং কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলেদের ১ হাজার ৬১০ দশমিক ৭০১ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাছ ধরতে গিয়ে নিহত ২৬ জন জেলের পরিবারকে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা, নিখোঁজ ১৩ জন জেলের পরিবারকে একই পরিমাণ অর্থ এবং অক্ষম একজন জেলেকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ২৯৫ জন উপকারভোগীকে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, সবজি বাগান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে মৎস্যখাত নিয়ে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওরের ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে ‘জাল যার, জলা তার’ নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, চিংড়ির একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশের সুপারশপগুলোতে মানসম্মত চিংড়ি সরবরাহের ব্যবস্থা সহজ করার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ দেলোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত সচিব ইমাম উদ্দীন কবির, অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওয়ারা জাহান, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো: খালেদ কনকসহ মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।