মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রকল্প বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রকল্পের প্রদর্শনী পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী এ আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) বিষয়টি জানিয়েছেন।
প্রদর্শনীতে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামানসহ গবেষকরা তাঁদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, দীর্ঘদিনের গবেষণার অগ্রগতি এবং দেশে বাণিজ্যিকভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রকল্পটির সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন সরকারপ্রধান।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর ধরে পরিচালিত এ গবেষণায় ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ (এইচটিএল) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য থেকে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
গবেষণাগারের পরীক্ষায় বায়োক্রুড উৎপাদনের হার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্যের কথা জানিয়েছেন গবেষকরা।
এইচটিএল প্রযুক্তিতে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানির উপস্থিতিতে জৈব পদার্থকে প্রক্রিয়াজাত করে তরল জ্বালানির কাঁচামাল তৈরি করা হয়। এ পদ্ধতিতে মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের স্লাজ, রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশের মতো উপাদান কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে গবেষণাগারে পাওয়া ফলাফলকে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য ডিজেল বা বাণিজ্যিক জ্বালানি তেলের উৎপাদন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। উৎপাদিত বায়োক্রুডকে পরিশোধন করে জ্বালানির মান, উৎপাদন ব্যয় এবং বৃহৎ পরিসরে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে।
গবেষণার পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন এক থেকে তিন টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ সক্ষম একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত প্ল্যান্টে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয়, পরিচালনাগত সক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ প্ল্যান্ট স্থাপনে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। সরকারি সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে গবেষণাগারের পর্যায় থেকে প্রযুক্তিটিকে শিল্প পর্যায়ে উন্নীত করার পথ তৈরি হবে।
গবেষকদের প্রত্যাশা, প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এর মাধ্যমে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে অর্জন করতে হলে পর্যাপ্ত কাঁচামালের প্রাপ্যতা, উৎপাদন সক্ষমতা, বায়োক্রুডের মান, পরিশোধন ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং অর্থনৈতিক লাভজনকতা যাচাই করা জরুরি। পাইলট প্ল্যান্টের ফলাফল এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি, পয়ঃশোধনাগার ও কৃষিজ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্যের একটি অংশকে জ্বালানি উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির উৎস তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
প্রকল্পটি সফল হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার এবং দেশীয় জ্বালানি প্রযুক্তির বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সুফল নির্ভর করবে প্রযুক্তিটির বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক সাফল্যের ওপর।
প্রকল্পের প্রদর্শনী পরিদর্শনকালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের এ উদ্যোগ এখন গবেষণাগারের সাফল্য থেকে শিল্প পর্যায়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। প্রস্তাবিত পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন, সরকারি সহায়তা এবং প্রযুক্তির অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে—এ উদ্ভাবন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে কতটা কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এম.জি.আর.নাছির মজুমদার, সম্পাদক : এস এম রফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ঠিকানা: সেঞ্চুরি সেন্টার: খ-২২৫, প্রগতি সরণি, মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১২।, ফোন নং : +৮৮-০২-৫৫০৫৫০৪৭ | মোবাইল নং: ০১৭১৬৩৭১২৮৬
www: dailybhor.com
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোর