বিদেশি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে হোয়াটস অ্যাপে চাঁদা দাবি, সিম বিহীন পকেট রাউটারে যোগাযোগ এবং ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রচারণা এভাবেই খুলনার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় ছিল আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘আরমান বাহিনী’। ভুক্তভোগীদের অনেকে ভয় ও নিরাপত্তা হীনতার কারণে থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে কিংবা সন্ত্রাসীদের নাম প্রকাশ করতে না চাওয়ায় চাঁদাবাজির অনেক ঘটনাই ‘ক্লুলেস’ থেকে যায়। তবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে গ্রুপটির প্রধান আরমান হোসেন দিপু ওরফে ‘শ্যুটার আরমানকে’। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি শটগান ও ১২ রাউন্ড শটগানের গুলি উদ্ধার করেছে র্যাব-৬।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে র্যাব-৬, খুলনার সদর দপ্তরে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়।
র্যাব-৬-এর উপ-অধিনায়ক ও কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. নাজমুল ইসলাম জানান, খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর, খালিশপুর, আড়ংঘাটা, দিঘলিয়া ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে আরমান বাহিনীর বিরুদ্ধে।
র্যাবের ভাষ্য, গ্রেপ্তার আরমান হোসেন দিপু ওরফে আরমান ওরফে আরমিন স্থানীয়ভাবে ‘শ্যুটার আরমান’ নামে পরিচিত। তার নেতৃত্বাধীন গ্রুপে ৮ থেকে ১০ জন সদস্যের নাম পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে তিনি একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে সেখান থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। এরপরই ‘আরমান বাহিনী’ নামে তার পরিচিতি তৈরি হয়।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেলেও ভুক্তভোগীদের একটি অংশ সন্ত্রাসীদের ভয়ে থানায় গিয়ে নাম প্রকাশ করতে চান না। ফলে অনেক ঘটনায় মামলা হলেও আসামিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে।
র্যাবের কাছে ভুক্তভোগীরা কখনো হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে, কখনো র্যাবের অফিসিয়াল নম্বরে এবং কখনো সরাসরি এসে তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্য সবসময় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে গ্রহণের সুযোগ না থাকলেও সেগুলো পর্যালোচনা করে তদন্তের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
তদন্তে বিদেশি নম্বর ব্যবহারের তথ্যও পেয়েছে র্যাব। এসব নম্বর দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে চাঁদা দাবি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া এমনকি গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, আরমান নিজে কোনো সিম ব্যবহার করতেন না। তিনি পকেট রাউটারের মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যবহৃত মোবাইল সিমের সূত্র ধরে তাকে শনাক্ত করা কঠিন ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় যোগাযোগের এসব মাধ্যম বিশ্লেষণ করেই তাকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
এ ছাড়া আরমান বাহিনীর কর্মকাণ্ডের প্রচারণায় ফেসবুক পেজ ব্যবহারের তথ্যও পেয়েছে র্যাব। এসব পেজের নাম ও সংশ্লিষ্ট তথ্য তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে। একই সঙ্গে র্যাবের কাছে আসা অন্যান্য তথ্যও সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে, যাতে তদন্তে এসব তথ্য কাজে লাগানো যায়।
গত ১৭ জুন খুলনার দৌলতপুরে একটি মসজিদে ঢুকে দুই মুসল্লিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনাতেও আরমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। র্যাব জানায়, ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ঘটনাটির ভিডিও ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
র্যাবের কর্মকর্তারা জানান, সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে আরমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি প্রথমে ওই ঘটনায় তার উপস্থিতির কথা স্বীকার করেন। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। তবে মসজিদে গুলির ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন।
র্যাবের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, আরমান হোসেন দিপুর বিরুদ্ধে খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন থানায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে মামুন মোল্যা হত্যা মামলা ২৫ জানুয়ারি ২০২১, মারজান মুন্না হত্যা মামলা ৩০ জুন ২০২২, কালা রানা হত্যা, ঘাটরা রাজিব হত্যা ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, যুবদল নেতা রাশু হত্যা ১৯ মার্চ ২০২৬, মনিরুল ইসলাম রনি হত্যা ২৮ আগস্ট ২০২৬ এবং ১৭ জুন দৌলতপুরের মসজিদে দুই মুসল্লিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনা রয়েছে।
তবে এসব মামলার কয়েকটিতে আরমানকে সন্দিগ্ধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
র্যাব বলছে, আরমানের গ্রেপ্তারের পর তার সহযোগীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। একই সঙ্গে আরমান বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
র্যাব-৬ জানায়, অভিযান পরিচালনায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ, জেলা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।
গ্রেপ্তার আরমানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে পৃথক আইনি কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর তদন্তও অব্যাহত রয়েছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এম.জি.আর.নাছির মজুমদার, সম্পাদক : এস এম রফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ঠিকানা: সেঞ্চুরি সেন্টার: খ-২২৫, প্রগতি সরণি, মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১২।, ফোন নং : +৮৮-০২-৫৫০৫৫০৪৭ | মোবাইল নং: ০১৭১৬৩৭১২৮৬
www: dailybhor.com
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোর