স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত উলশী-যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্পের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে যশোরের শার্শায় তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রকল্পটির খননকাজ উদ্বোধন করেন। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে বাস্তবায়িত এ উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে ‘উলশী মডেল’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
পাঁচ দশক আগে খাদ্য ঘাটতি, কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকট মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। খাল খননের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। পাশাপাশি উন্নয়নকাজে স্থানীয় জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্ত করে স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ছিল।
স্বাধীনতার পর দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন ছিল অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচিতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি ছিল এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম উদ্যোগ। উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্প ছিল স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক সেই কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
উলশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত বেতনা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি খননে স্থানীয় কৃষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। হাজারো মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে কোদাল ও ঝুড়ি নিয়ে কাজে যোগ দেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণকারীদের দুপুরে রুটি ও গুড় দেওয়া হতো।
স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে প্রায় ছয় মাসে খননকাজ শেষ হয়। এর ফলে উত্তর শার্শার পাঁচটি বড় বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি হয় এবং প্রায় ২২ হাজার একর জমিতে চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়। খালের দুই পাশে সেচের জন্য স্থাপন করা হয় প্রায় ২০টি পাম্প। এতে এলাকায় ইরি-বোরো ধানের চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে।
স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে ওঠে ‘উলশী মডেল’
প্রকল্পটির বিশেষত্ব ছিল উন্নয়নকাজে সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ। ঠিকাদারি শ্রমিকনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে স্থানীয় জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমে খালটি খনন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে ‘উলশী মডেল’ নামে পরিচিতি পায়।
উলশী গ্রামের শতবর্ষী বাসিন্দা আবদুল বারিক মন্ডল ওই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে করে গ্রামে এসেছিলেন। তিনি নিজেই কোদাল হাতে মাটি কাটেন এবং মাটি ভর্তি ঝুড়ি বহনেও অংশ নেন।
বারিক মন্ডলের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, খননকাজের সময় জিয়াউর রহমান তাঁর ভাই করিম বকস মণ্ডলের মাথায় মাটি ভর্তি ঝুড়ি তুলে দিয়েছিলেন। এ সময় করিমের মাথায় থাকা স্থানীয়ভাবে ‘টোকা’ বা ‘মাথাল’ নামে পরিচিত বাঁশ ও তালপাতার তৈরি ঐতিহ্যবাহী টুপিটি তিনি নিজের মাথায় পরেন। ঘটনাটি স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
শার্শা উপজেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও প্রবীণ নেতা খায়রুজ্জামান মধু বলেন, ‘উলশীর খাল শুধু একটি খাল নয়, এটি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন। এই খাল খনন হয়েছিল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, কৃষিকে টিকিয়ে রাখার জন্য।’
খননকাজের সময় জিয়াউর রহমান স্থানীয় একটি ভবনে রাত যাপন করেন। পরে ভবনটি কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে কৃষকদের নিয়ে বৈঠক ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হতো। বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল। ফলে খাল খননের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষকদের সংগঠিত করার কাজেও স্থানটি ভূমিকা রাখে।
উলশী প্রকল্পের পর দেশজুড়ে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়। কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ১৯৩টি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়, যার মোট দৈর্ঘ্য ছিল ৬৭৫ দশমিক ১৮ মাইল। এ পরিসংখ্যান দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির বিস্তারের চিত্র তুলে ধরে।
দীর্ঘ অবহেলার পর পুনঃখননের উদ্যোগ
সময়ের সঙ্গে নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটিতে পলি জমে পানি প্রবাহ ব্যাহত হয়। একপর্যায়ে খালটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট দেখা দিতে থাকে। খালের পাড়ের স্মৃতিচিহ্ন ও ঐতিহাসিক ভবনটির অবস্থাও নাজুক হয়ে যায়। এ অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে খালটি পুনরুদ্ধার ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, ঐতিহাসিক খালটির পুনঃখননের জন্য বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। চার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের একটি প্রস্তাবও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
যশোর-৩ (যশোর সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, উলশী খাল পুনঃখনন এবং যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আধুনিকায়ন ছিল জনগণের কাছে দেওয়া নির্বাচনী অঙ্গীকার। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে যশোরের উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
পাঁচ দশক পর নতুন অধ্যায়
উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্পের ৫০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে গত ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খালটির পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। তিনি কোদাল হাতে প্রথম মাটি কেটে কাজের সূচনা করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা ঐতিহ্যবাহী টোকা মাথায় ও হাতে কোদাল নিয়ে খালের দুই পাড়ে সমবেত হন।
উদ্বোধন উপলক্ষে দেশ ও জনগণের সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচ দশক আগে জিয়াউর রহমানের উদ্বোধন করা খালটির পাশে পুনঃখনন কার্যক্রমের স্মারক স্থাপন করা হয়েছে। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পুনঃখনন সম্পন্ন হলে খালটির পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে এবং মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে খালটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক উন্নয়ন উদ্যোগের স্মৃতি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
পাঁচ দশক আগে উলশী-যদুনাথপুরে যে উদ্যোগের মধ্য দিয়ে উন্নয়নকাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছিল, ৫০ বছর পূর্তিতে পুনঃখনন কর্মসূচি সেই ঐতিহাসিক প্রকল্পকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এম.জি.আর.নাছির মজুমদার, সম্পাদক : এস এম রফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ঠিকানা: সেঞ্চুরি সেন্টার: খ-২২৫, প্রগতি সরণি, মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১২।, ফোন নং : +৮৮-০২-৫৫০৫৫০৪৭ | মোবাইল নং: ০১৭১৬৩৭১২৮৬
www: dailybhor.com
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোর