এলজিইডি ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রকল্পের ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আব্দুল মান্নান
ভৌত অগ্রগতি ও আর্থিক ব্যয় অসামঞ্জস্য : তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে জমা,
জাহেদী আরমান
প্রকাশিত জুন ২৩, ২০২৬, ১৭:২৮ অপরাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর ৫ম ব্যাচের কর্মকর্তা ও বর্তমানে গাজীপুরে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় কর্মরত অবস্থায় তিনটি উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পগুলোর প্রকৃত বাস্তবায়ন ছাড়াই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোঃ আব্দুল মান্নান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তিনি কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে।
তথ্য অনুযায়ী, স্মারক নং-৪৬.০২.১২০০.৯৭৪.০৭.৪৮০.২৩/৯৬৪, তারিখ ১৬-০৪-২০২৩-এর আওতায় ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের একটি প্রকল্পের চুক্তি মূল্য ছিল ৮,৬৯,৫০,২৮১.২৯ টাকা। প্রকল্পটির কাজ শুরু ও সমাপ্তির নির্ধারিত সময় ছিল যথাক্রমে ২৪-০৪-২০২৩ এবং ২৩-০৬-২০২৪। উপজেলা প্রকৌশলী, সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল মান্নান ১৭-০৪-২০২৩ তারিখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইবিআর জেভি সরকার সি কে-কে কার্যাদেশ প্রদান করেন।
একইভাবে স্মারক নং-২৩/৯৭৪, তারিখ ১৭-০৪-২০২৩-এর আওতায় প্যাকেজ নং DW-69-এর চুক্তি মূল্য ছিল ৬,১২,১৫,৫২৩.০০ টাকা। প্রকল্পটির কাজ শুরু ও সমাপ্তির তারিখ নির্ধারিত ছিল যথাক্রমে ২৪-০৫-২০২৩ এবং ২৩-০৬-২০২৪। দরপত্র অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইবিআর জেভি সরকার সি কে-কে বাস্তবায়নের জন্য চিঠি প্রদান করা হয়।
এছাড়া প্যাকেজ নং IRIDP-3/DW-82-এর চুক্তিমূল্য ছিল ৪,০২,৯৭,০৩১ টাকা। প্রকল্পটির কাজ শুরু ও সমাপ্তির সময় নির্ধারিত ছিল যথাক্রমে ০২-০৭-২০২৩ এবং ০১-১০-২০২৪। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লি.-কে লেটার অব প্রোসিড প্রদান করা হয়।
অভিযোগকারী সূত্রের দাবি, উল্লিখিত তিনটি প্রকল্পের মধ্যে নির্ধারিত কাজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না করেই প্রায় ১৫ কোটি টাকার বেশি অর্থ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শাহাদাত হোসেন স্বাক্ষরিত স্মারক নং-৪৬.০২.০০০০.০৫৫.০০০.২৭.০০০১.২৫/৭১, তারিখ ০২-০৩-২০২৬ অনুযায়ী একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান প্রকৌশলীর নিকট দাখিল করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে “অগ্রাধিকার ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩”-এর আওতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাস্তবায়নাধীন তিনটি প্যাকেজ (DW-69, DW-70 ও DW-82)-এর প্রকৃত ভৌত অগ্রগতির সঙ্গে আর্থিক অগ্রগতির অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হওয়ায় সরেজমিন তদন্ত পরিচালনা করা হয়। তদন্ত শেষে ২২৪ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা এবং বর্তমানে গাজীপুর জেলায় কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল মান্নানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিব্রত কন্ঠে বলেন, “আমি এখন অফিসের বাইরে সাইট ভিজিটে আছি। ভাই, আমি এ বিষয়ে এখন কিছু বলতে চাচ্ছি না। আপনার সঙ্গে দেখা হলে বিষয়টি নিয়ে সামনাসামনি বিস্তারিত বলব। এখন না হয় কিছু বলি।”
অগ্রাধিকার প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক বলেন, “তিনটি কাজের মধ্যে একটি কাজ খুব সম্ভবত সম্পন্ন হয়েছে। বাকি দুটি কাজ চলতি জুন মাসের পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্টরা বাস্তবায়ন করবেন।”
এ বিষয়ে প্রশাসন শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী (শৃঙ্খলা ও তদন্ত) কোনো মন্তব্য করেননি। তবে এলজিইডির প্রশাসন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুঠোফোনে বলেন, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে তিনি জানাবেন।
চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলজিইডি সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন অনেক সময় চূড়ান্ত পরিণতি পায় না। তাদের মতে, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন কারণে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো অনেক ক্ষেত্রে ধামাচাপা পড়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ ও তদন্তের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হলে তা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও জবাবদিহিতার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।