বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, টেন্ডার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, আর্থিক লেনদেন এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকার পর গত ৩ মে জ্যেষ্ঠ সিএসও ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. আমিনুল ইসলামকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটিতে উত্তেজনা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে ৩ ও ৪ মে আন্দোলন, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গেটে তালা এবং পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সূত্রের অভিযোগ, ওই সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের আদেশ বাতিল এবং পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতেও একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মহাপরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের পর ড. হাবিবুর রহমান মুকুলকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে ওঠে। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও টেন্ডারসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
গত ১৪ আগস্ট ব্রি’র ৯৩তম বোর্ড অব ম্যানেজমেন্ট সভায় ১২ জন এসএসওকে পিএসও পদে পদোন্নতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়েছে, এ তালিকায় ড. হাবিবুর রহমান মুকুলও ছিলেন। একজন জ্যেষ্ঠ নারী বিজ্ঞানীকে বদলির ভয় দেখিয়ে পদোন্নতি না নেওয়ার বিষয়ে লিখিত দিতে বাধ্য করার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া জিকিউএন বিভাগের ড. তাপস কুমার সরকারের পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তার এসএসও পদে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে আগে মামলা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা ও অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের এক আত্মীয়সহ কয়েকজনের পদোন্নতিতে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্রি’র বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট ছিলেন—এমন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফার্ম সুপারিন্টেন্ডেন্ট ও সিনিয়র সহকারী পরিচালক পদে কাওছার আহমেদের পদোন্নতি নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আগের সময়ে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকিউরমেন্ট ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই ব্যক্তিকে বর্তমান প্রশাসনে আর্থিক লেনদেনের কাজে ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।
বিগত সময়ে নিয়োগ পাওয়া এক ফটোগ্রাফারকে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তিনি আগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে তৎকালীন প্রশাসনের পক্ষে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং বর্তমান মহাপরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়ায়ও অর্থায়ন করেছিলেন। এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্রি’র হিসাব বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. রুহুল আমিনকে অফিস চলাকালে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও করা হয়েছে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. আব্দুর রউফ কমিশনের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এবং সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন—এমন অভিযোগ তুলে তারেক সালাউদ্দিনকে ব্রি’র হিসাব বিভাগের প্রধান হিসেবে পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের আরেকটি অংশে ব্রি’র খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলামকে সদর দপ্তরে বদলি করে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ব্রি’র সরকারি ওয়েবসাইটেও সিরাজুল ইসলামকে খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক কার্যালয়ের সিএসও ও প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং আত্মীয়স্বজনকে ব্রিতে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ১৫ সেপ্টেম্বর তাকে খাগড়াছড়ি থেকে সদর দপ্তরে বদলি করে আনার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রয়োজন।
ড. রফিকুল ইসলাম মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিতর্কিত এক নারী শ্রমিককে বদলি করে ব্রিতে আনার অভিযোগও করা হয়েছে। ওই শ্রমিকের বিরুদ্ধে অতীতে এক কর্মচারীর স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করে বাসা থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ব্রি’র পরিচালক (গবেষণা) পদে ড. মো. ইফতেখারুদ্দৌলাকে নিয়োগের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে বিশেষ সুপারিশ পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে তিনি সাবেক মহাপরিচালক ড. শাহজাহানের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এবং স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে অর্থায়ন ও প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ৩ ও ৪ মে’র ঘটনাকে কেন্দ্র করে যারা সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পক্ষে ছিলেন, তাদের ওপর পরবর্তী সময়ে চাপ ও বদলির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। স্টোর অফিসার মো. সেলিমকে বদলির জন্য নথি উপস্থাপনের বিষয়েও এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে ব্রি বিজ্ঞানী সমিতির সভাপতি ড. মো. ইব্রাহিমের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের নির্দেশ মহাপরিচালক দিয়েছেন কি না, তা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে।
ব্রি’র সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী ড. রফিকুল ইসলামের দায়িত্ব পালনের বৈধতা নিয়ে ‘জাস্টিস ডিমান্ড নোটিশ’ দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তার দাবি, গত ১৭ বছরে প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
ড. মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী বলেন, আগের সময়ের সুবিধাভোগীদের অনেকেই পরবর্তী প্রশাসনেও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, বিতর্কিত নির্বাহী ও অভিযুক্তদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অতীত ও বর্তমানের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
ব্রি নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হলেও অভিযোগগুলোর সবকটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্যও পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রি’র মহাপরিচালক হিসেবে ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মুকুলের দায়িত্ব পালনের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এম.জি.আর.নাছির মজুমদার, সম্পাদক : এস এম রফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ঠিকানা: সেঞ্চুরি সেন্টার: খ-২২৫, প্রগতি সরণি, মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১২।, ফোন নং : +৮৮-০২-৫৫০৫৫০৪৭ | মোবাইল নং: ০১৭১৬৩৭১২৮৬
www: dailybhor.com
© ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোর