• ২৯শে আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উষ্ণ আবহাওয়া গর্ভবতী নারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত আগস্ট ২৩, ২০২৫, ১৬:৪৯ অপরাহ্ণ
উষ্ণ আবহাওয়া গর্ভবতী নারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
সংবাদটি শেয়ার করুন....

তৃতীয়বারের মতো গর্ভধারণ করেছেন ২০ বছর বয়সী সাগোবাই। সম্প্রতি হাসপাতালে শারীরিক পরীক্ষার সময় চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। বর্তমানে তিনি নিজেকে সুস্থ বোধ করলেও, গত কয়েক মাসে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে যখন তাপমাত্রা ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখন সাগোবাই প্রায়ই মাথা ঘোরা ও শরীর পানিশূন্যতার সমস্যায় ভুগেছেন।

তিনি বলছেন, আগের তুলনায় গরম অনেক বেশি। এই চরম তাপমাত্রা তার এবং অনাগত সন্তানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে তার আশঙ্কা।

গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী জটিলতায় তাপমাত্রার প্রভাব কতটা, তা খতিয়ে দেখছে আগা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডা. জাই দাস-এর নেতৃত্বাধীন একটি গবেষণা দল। তাদের উদ্বেগের কারণও রয়েছে। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ৪৫ লাখেরও বেশি নারী ও নবজাতক গর্ভধারণ, প্রসব বা প্রসব-পরবর্তী জটিলতায় প্রাণ হারান। এসব মৃত্যুর পেছনে ক্রমেই বড় ভূমিকা নিচ্ছে তাপমাত্রাজনিত কারণগুলো।

সাগোবাই হচ্ছেন এমন এক বৃহৎ বৈশ্বিক গবেষণার অংশ, যেখানে এই প্রথম এত বড় পরিসরে খতিয়ে দেখা হচ্ছে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত গরমের প্রভাব। বর্তমানে ৪০০ নারী এতে অংশ নিচ্ছেন এবং আরও প্রায় ৬ হাজার নারীর অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

গবেষণাটিতে অংশ নেওয়ার জন্য প্রতি নারীকে গর্ভাবস্থার ১৩তম সপ্তাহের আগেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়—যে সময় অনেকেই এখনো গর্ভধারণের বিষয়টি প্রকাশও করেন না। অংশগ্রহণকারীদের একাধিক শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে আল্ট্রাসাউন্ড পর্যবেক্ষণ, ২৪ ঘণ্টা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিরীক্ষণকারী বিশেষ ডিভাইস পরিধান করতে হয়। এমনকি সন্তান জন্মের মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই সংগ্রহ করা হয় তাদের প্লাসেন্টার নমুনা।

সব কিছুই হচ্ছে পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে অনেক সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক কিংবা ইন্টারনেট সংযোগই অনুপস্থিত।

সব জটিল প্রক্রিয়া ও কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও গবেষকরা আশাবাদী—তাদের এই প্রচেষ্টা সফল হবে। গবেষণার ফলাফল থেকে স্পষ্ট ধারণা মিলবে, কীভাবে এবং কেন উষ্ণ জলবায়ু গর্ভবতী নারী ও নবজাতকদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এটি এমন এক বৈশ্বিক সংকট, যা আজ প্রায় সব দেশেই দৃশ্যমান এবং আগামী দিনগুলোতে এর পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে।

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের ডা. আনা বোনেল বলেন, সন্দেহ নেই, উষ্ণ তাপমাত্রা বর্তমানে মাতৃস্বাস্থ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি থামিয়ে দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে এবং তীব্র আবহাওয়া আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। উচ্চ তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্মের ওপর চাপ ফেলে। গরমের সঙ্গে লড়াই করতে শরীরের বাড়তি শ্রম করতে হয়—যা সুস্থ মানুষের জন্যও চাপের, আর গর্ভবতী নারীদের জন্য আরও বিপজ্জনক।

গর্ভাবস্থায় নারীদের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়, যাতে গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। এই বাড়তি বিপাক শরীরে অতিরিক্ত উত্তাপ তৈরি করে। একই সময় রক্তের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়ে হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে। এর ফলে পানিশূন্যতা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে, যা মা ও শিশু—উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে, ফলে সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

নবজাতকেরাও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে দুর্বল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।

তথ্য যা প্রমাণ করে—তাপমাত্রা বাড়লে বাড়ে সময়ের আগেই প্রসবের ঝুঁকি

যদিও গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও গর্ভকালীন জটিলতার সম্পর্ক আজ গুরুত্বপূর্ণ এক স্বাস্থ্য ইস্যু, তবে এই সংযোগ বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত হতে সময় লেগেছে। ২০১০ সালে প্রকাশিত প্রথম বড় পরিসরের গবেষণায় এই সম্পর্ক স্পষ্ট হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার গ্রীষ্মকালীন আট বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—প্রায় ৬০ হাজার জন্মের মধ্যে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের আগেই (৩৭ সপ্তাহের আগে) প্রসবের হারও বেড়েছে। গবেষণাটি আরও জানায়, এমন প্রি-টার্ম জন্ম থেকেই ১ মাসের কম বয়সী নবজাতকের প্রায় ৪০ শতাংশ মৃত্যু ঘটে।

এই সম্পর্ক এখন আর শুধু একটি অঞ্চলের পর্যবেক্ষণ নয়—বিশ্বজুড়েই নানা গবেষণায় এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ৬৬টি দেশের ১৯৮টি গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রসবের আগের মাসে তাপমাত্রা গড়ে প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে প্রি-টার্ম (সময়ের আগেই) জন্মের ঝুঁকি প্রায় ৪ শতাংশ বাড়ে। একই সঙ্গে দেখা যায়, তীব্র তাপপ্রবাহ—অর্থাৎ একটানা দুই বা তার বেশি দিন স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত গরম পড়লে—সেই সময়কালীন প্রসবের ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

যেহেতু অধিকাংশ গবেষণাই ধনী, শীতল জলবায়ুর দেশে হয়েছে তাই উন্নয়নশীল গরম দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।