প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২০, ২০২৬, ৫:০১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ২০, ২০২৬, ২:২৮ পূর্বাহ্ণ

বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ তৈরি করা হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বিরোধী দলকে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিরোধী দল অবশ্যই সরকারের সমালোচনা করবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করা হলে তা হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি।
আজ রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, আর অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করছে। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে দেশের স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা।
তিনি বলেন, সরকার দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। জনগণের সমর্থন নিয়ে যেমন বিরোধী দল সংসদে দায়িত্ব পালন করছে, তেমনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকারও দায়িত্ব পালন করছে। শুধু সরকারি দল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা শুধু বিরোধী দল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সম্মান জানাতে সরকারের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তাঁদের ছিল।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যাঁরা রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানাতে সবার এগিয়ে আসা উচিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ হচ্ছে, আত্মত্যাগকারীদের পাশে থাকা এবং তাঁদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করা।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সব বিষয়ে একমত না হওয়াই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, চিকিৎসাসেবা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব অবস্থান থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই জনগণ তাঁদের সংসদে পাঠিয়েছেন। সংসদে যুক্তি ও মতামত তুলে ধরে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারেন।
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের প্রয়োজন ও দেশের উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তবে এসব স্থাপনা তৈরির সময় প্রকৃতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি বলেন, উন্নয়নকাজের পাশাপাশি বিদ্যমান গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরি। ভবিষ্যতে স্থাপত্য ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রকৃতি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচ্ছন্নতার অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও সরকারি হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকাগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে আরও মনোযোগ প্রয়োজন।
হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, রোগীরা যাতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা নিতে পারেন, সে জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের আরও সচেতন হতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিচ্ছন্ন রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারি নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিজেদের আচরণেও পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
পরিবেশদূষণ ও অপরিচ্ছন্নতা মানুষের রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ায় উল্লেখ করে তিনি একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
ওসমানী উদ্যান ও জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দর্শনার্থীদের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যান জনগণের এবং রাষ্ট্রের সম্পদ। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলেও তা যথাযথভাবে পালনে নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মিল রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে।
রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সবার নিরাপদে বসবাসের প্রত্যাশাও শহীদদের আকাঙ্ক্ষার অংশ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব প্রত্যাশা পূরণের মধ্য দিয়েই তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার ধীরে ধীরে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তারেক রহমান।
এর আগে সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন তিনি।
উদ্বোধনের পর স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করে এর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। এ সময় উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগারও পরিদর্শন করেন তিনি।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি ৯০ ফুট উঁচু এবং প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এর গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য রয়েছে। এসব ভাস্কর্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা এবং জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথও রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল আলম।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ হাবিবসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।