• ১৪ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কৃষকের গল্পে কোর্টরুম ড্রামা, অক্ষয়-আরশাদকে ছাপিয়ে হিরো সৌরভ শুক্লা

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ২৬, ২০২৫, ১৩:৩৩ অপরাহ্ণ
কৃষকের গল্পে কোর্টরুম ড্রামা, অক্ষয়-আরশাদকে ছাপিয়ে হিরো সৌরভ শুক্লা
সংবাদটি শেয়ার করুন....

ভারতের সাম্প্রতিক সিনেমায় সামাজিক বাস্তবতা, কোর্টরুম ড্রামা ও রাজনৈতিক স্যাটায়ারের সমন্বয় এখন খুব একটা দেখা যায় না। ঠিক সেই অভাবটাই পূরণ করেছিল জলি এলএলবি ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রথম দুই ছবি। তাই তৃতীয় কিস্তিকে ঘিরে দর্শকের প্রত্যাশাও ছিল বেশি। সেই চাপ মাথায় রেখে পরিচালক সুভাস কাপুর তৈরি করেছেন জলি এলএলবি ৩, যেখানে কোর্টরুমের ব্যঙ্গ-হাস্যরস, সিস্টেমের কঠোর বাস্তবতা এবং কৃষকের নীরব আর্তনাদ একসঙ্গে মিশেছে। সিনেমার একদম শেষের দৃশ্যে পরিচালক দর্শককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় মুভির মূল বার্তায়—প্রতিটি খাবারের পেছনের কৃষকের ঘাম, শ্রম ও আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে। মূল গল্প আবর্তিত হয়েছে কৃষকের দুঃখ-কষ্ট, অনিশ্চয়তা, আত্মহত্যার প্রবণতা এবং কর্পোরেট কোম্পানির শোষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ঘিরে। পরিচালক এগুলোকে কখনো অতিরঞ্জিত না করে ব্যঙ্গ, হাস্যরস আর সংবেদনশীলতার মাধ্যমে মানবিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

জলি এলএলবি ১ ও ২ এর পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অক্ষয় কুমার ও আরশাদ ওয়ারসিকে একসঙ্গে পর্দায় এনে দুজনকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া। দর্শকের আশঙ্কা ছিল, অক্ষয়ের স্টারডম যেন আরশাদের বাস্তবসম্মত অভিনয়কে ছাপিয়ে না যায়। কিন্তু ছবির প্রথম ঘণ্টাতেই সেই ভয় কেটে যায়। দুজনই সমান গুরুত্ব পেয়েছেন, দুজনের চরিত্র গল্পকে সামনে এগিয়েছে, আর মুখোমুখি সংলাপ বিনিময় সিনেমার সবচেয়ে উপভোগ্য মুহূর্ত তৈরি করেছে।

তবে ছবির প্রকৃত নায়ক নিঃসন্দেহে জজ সুন্দর লাল ত্রিপাঠী, অর্থাৎ সৌরভ শুক্লা। তার উপস্থিতি কোর্টরুমকে জীবন্ত করে তোলে। তীক্ষ্ণ সংলাপ, দুর্দান্ত কমেডিক টাইমিং ও মানবিক মুহূর্ত—সব মিলিয়ে তিনি সিনেমাটিকে নতুন উচ্চতায় তুলেছেন। পরিচালক তার চরিত্রে একটি ছোট প্রেমের পর্ব যোগ করেছেন, যা গল্প বদলায় না, বরং কার্যকর কৌতুক রিলিফ তৈরি করে।

অভিনয়ের দিক থেকে অক্ষয় কুমার তার পরিচিত স্মার্ট, কৌতুকমিশ্রিত লড়াকু আইনজীবীর চরিত্রে যথেষ্ট দাগ রেখেছেন। আরশাদ ওয়ারসির স্বাভাবিক অভিনয়ও আগের মতোই বাস্তবসম্মত ও সংযত। ভিলেন গুজরাত রাওয়ের চরিত্রটি গ্রে শেডের, যার দৃঢ়তা ও হুমকিময় উপস্থিতি দর্শককে টেনে ধরে। হুমা কোরেশী ও অমৃতা রাও যদিও কম সময় পেয়েছেন, তবে তারা গল্পকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রেখেছেন। কৃষকের ভূমিকায় থাকা অভিনেতারাও অত্যন্ত ন্যাচারাল অভিনয় করেছেন।

টেকনিক্যাল দিক থেকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেশ শক্তিশালী। বিশেষত কোর্টরুম দৃশ্যে উত্তেজনা তৈরি ও সামাজিক বার্তা তুলে ধরতে সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্ক্রিনপ্লে ধারাবাহিক হলেও মাঝামাঝি অংশে কোথাও কোথাও গতি কমে যায়। কিছু দৃশ্য অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও সংলাপ ও হাস্যরস সেই ঘাটতি পূরণ করে দেয়। আগের দুই পর্বের মতো সম্পূর্ণ কোর্টরুমভিত্তিক ড্রামা না থাকায় গল্পের একটি বড় অংশ আদালতের বাইরের বাস্তবতায় কাটে, যা দর্শকভেদে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

গল্পে উঠে এসেছে কৃষকের জীবন-মরণ যুদ্ধ, উন্নয়নের নামে সর্বস্ব হারানোর ভয় ও আত্মহত্যার নির্মম বাস্তবতা। সরকারি ব্যবস্থার অবহেলাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করেছেন পরিচালক। কোর্টরুমে অক্ষয়-আরশাদের যুক্তিতর্ক এবং সৌরভ শুক্লার মন্তব্য সমাজব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে।

সুভাস কাপুরের দিকনির্দেশনা পরিমিত, সংবেদনশীল এবং সুনিয়ন্ত্রিত। একটি সামাজিক ইস্যুকে বিনোদনের আবহে তুলে ধরার কাজ তিনি করেছেন সফলভাবে।

সব মিলিয়ে, জলি এলএলবি ৩ নিছক বিনোদন নয়—এটি সমাজের উপেক্ষিত মানুষের গল্প, কৃষকের প্রতি সম্মান এবং নীরব প্রতিবাদের এক শক্তিশালী প্রতিফলন।