খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক রূপ নিয়েছে। নগরীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন উপচে পড়া রোগীর ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। নির্ধারিত শয্যা ফুরিয়ে যাওয়ায় হাসপাতালের করিডোর, বারান্দা এমনকি মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও চিকিৎসক-নার্সসহ জনবলের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে চিকিৎসাব্যবস্থা।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের শুরু থেকে গত ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগে মোট ১৪,১২৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৮ জন। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা বোঝা যায় পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। গত ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে বিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা যেখানে ছিল ২,০৭১, তা হু হু করে বেড়ে ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৬,০৯৪ এবং সেপ্টেম্বরের শেষে গিয়ে দাঁড়ায় ১৩,৪১১ জনে। আগস্ট মাসে চার হাজারের বেশি নতুন রোগী ভর্তি হলেও শুধু সেপ্টেম্বরেই সেই সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়। আগস্টের শেষ দিকে মৃতের সংখ্যা ২০ জন থাকলেও মাস ঘুরতেই তা বেড়ে ৪৮ জনে পৌঁছায়। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেকহা) সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর রোগীরা বাধ্য হয়ে করিডোর ও বারান্দার মেঝেতে অবস্থান নিয়েছেন। রোগীর স্বজনদের ক্ষোভ, চাহিদামতো ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম মিলছে না। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী খাদিজা খাতুনের এক স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, “এখানে কোনো শয্যা খালি নেই। ভেবেছিলাম একটা কেবিন পাব, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কেবিন জোটেনি।” আরেক স্বজন আসাদুল জানান, হাসপাতালের সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় অনেক জরুরি ওষুধই বাইরে থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে তাদের। চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্স ও ওয়ার্ড বয়ের সংকট আরও তীব্র বলে অভিযোগ করেন তারা।
এদিকে রোগীর চরম চাপের মুখে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। খুলনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহা. রফিকুল ইসলাম গাজী জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ শয্যার ব্যবস্থা না থাকায় হঠাৎ রোগীর এই চাপ সামলাতে তাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আমিরুল ইসলাম দাবি করেন, তাদের হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে এবং কোনো রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। জনবলের কিছুটা ঘাটতি থাকলেও পরিস্থিতি চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোহাদ্দেস হোসেনের ভাষ্য ভিন্ন; তিনি জানান, ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ চাপ সামলাতে উচ্চ মহলে তিনি ছয়জন চিকিৎসক চেয়ে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু পেয়েছেন মাত্র দুজনকে। বর্তমানে যেসব এলাকায় রোগীর চাপ কিছুটা কম, সেখান থেকে জনবল পুনর্বণ্টনের চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ১৩,৬৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১২,১২৪ জন এবং চিকিৎসাধীন আছেন ১,১৬৭ জন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য বিভাগে রেফার করা হয়েছে ৩২৮ জনকে।
শুধু সাধারণ হাসপাতাল নয়, শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ডেঙ্গুর হানা উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে। খুলনা শিশু হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও সুপারিনটেনডেন্ট ডা. প্রদীপ দেবনাথ জানান, ২৭৫ শয্যার এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি সবসময় রোগীতে পূর্ণ থাকে, ফলে বাধ্য হয়ে অনেক শিশুকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি নগরীর বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালেও শয্যা সংকট চরমে পৌঁছেছে। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোকাররম বিল্লাহ আনসারি জানান, হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই না থাকায় অনেক ডেঙ্গু রোগীকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।