নির্বাচনে যেভাবে চ্যালেঞ্জিং প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন জামায়াত আমির: রয়টার্স
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ১৭:৩৮ অপরাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামীর এবার উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেছে এবং দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার ও বিলবোর্ডে সাদা দাড়িওয়ালা এই নেতার ছবি দেখা যাচ্ছে, যেখানে ভোটারদের দেশের ‘প্রথম ইসলামপন্থী সরকার’ গঠনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। ৬৭ বছর বয়সী শফিকুর রহমান এতদিন মূলত ইসলামপন্থী বলয়ের বাইরে তেমন পরিচিত ছিলেন না, তবে দলের নেতৃত্বে এসে তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় অন্যতম শক্ত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তাদের একসময়ের জোট শরিক ও বর্তমান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিপক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে। এটি হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালানোর পর বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন। রয়টার্স জানায়, বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলিম, ফলে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ; যদিও ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম, তবু সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াত, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, এবার তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফল হতে পারে—যা দেশের মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ইসলামপন্থী দলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়, জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি করা হয়, কয়েকজনকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং দলটিকে নিষিদ্ধ করে কার্যত আন্ডারগ্রাউন্ডে ঠেলে দেওয়া হয়। ২০২২ সালে বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানকেও নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনকে সহায়তার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে ১৫ মাস কারাভোগ করানো হয়। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান জামায়াত ও শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে দেয়; শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং ২০২৫ সালে আদালত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে জামায়াত আবার প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পায়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর দলটি দ্রুত মানবিক সহায়তা, বন্যা-ত্রাণসহ নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয় এবং সাদা পোশাক ও সাদা দাড়িতে শফিকুর রহমান এসব কর্মসূচিতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। গত বছরের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বারবার কথা বলার চেষ্টা করলেও দলটিকে দমন করা হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর তারা আবার উঠে আসার সুযোগ পেয়েছেন। জামায়াত তাদের নেতাকে বিনয়ী, আন্তরিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী একজন ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরে। বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শফি এমডি মোস্তফার মতে, অভ্যুত্থানের পর প্রথম এক মাস দেশে তেমন দৃশ্যমান নেতৃত্ব ছিল না এবং সেই সুযোগেই তিনি দ্রুত দেশজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন। নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত নিজেদের ইসলামি মূল্যবোধনির্ভর ‘পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক বিকল্প’ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা অনেক ভোটারের মধ্যে সাড়া ফেলেছে; জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গে জোট তাদের তরুণ ভোটারদের মধ্যেও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। এমনকি গেম অব থ্রোনস অনুপ্রাণিত পোস্টারে ‘দাদু ইজ কামিং’ স্লোগান ব্যবহার করে তাকে সহজ-সরল ও বন্ধুসুলভ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। যদিও কেউ কেউ তাকে তুলনামূলক মধ্যপন্থী মনে করছেন, যিনি সুশাসন, দুর্নীতি দমন ও সামাজিক ন্যায়ের ওপর জোর দেন এবং সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শফিকুর রহমান নিজেও বলেছেন, জামায়াত মধ্যপন্থী ও যুক্তিনির্ভর হলেও তাদের নীতিমালা ইসলামি ও কোরআনভিত্তিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে। তবে নারীদের বিষয়ে তার মন্তব্য বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং দলটি এবার কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি; তিনি বলেছেন, নারীরা যেন দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ না করেন যাতে পারিবারিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।