• ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১২ বছর পর নতুন জাতীয় বেতন স্কেল: সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার, সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০১:২৩ পূর্বাহ্ণ
১২ বছর পর নতুন জাতীয় বেতন স্কেল: সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার, সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা
সংবাদটি শেয়ার করুন....

দীর্ঘ ১২ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা।

নতুন বেতন স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ধাপে ধাপে এর বাস্তবায়ন করা হবে।

আজ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৯তম বৈঠকে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে সন্ধ্যায় তথ্য অধিদফতরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি।

তিনি জানান, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অধিকতর যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যেই জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন পে-স্কেলের মূল বেতনের ৩০ শতাংশ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে পারে। পরবর্তী বছরের শুরুতে আরও ৩৫ শতাংশ এবং তার পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এরপর সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের সুপারিশ করা হতে পারে।

নতুন বেতন কাঠামোতে ন্যায্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।

এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

অষ্টম পে কমিশন গঠনের প্রায় এক দশক পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় পে কমিশন গঠন করে।

সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ওই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

পরে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সচিব কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটির প্রতিবেদনও মন্ত্রিসভার বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়।

সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।

নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, বর্তমান সরকার ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই একইসঙ্গে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

তবে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং অসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের পূর্বে অবসর নেওয়া ব্যক্তিদের তথ্য না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে পুরো ব্যবস্থা চালু না করে পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর পরিবর্তে অবসরভোগী পেনশনধারীদের জীবনযাত্রার মান ও বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—

  • ৯,০০০ টাকা বা তার কম নিট পেনশন হলে বৃদ্ধি পাবে ১০০ শতাংশ;
  • ৯,০০১ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হলে বৃদ্ধি পাবে ৭৫ শতাংশ;
  • ২০,০০১ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত হলে বৃদ্ধি পাবে ৬৫ শতাংশ;
  • ৩০,০০১ থেকে ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত হলে বৃদ্ধি পাবে ৬০ শতাংশ;
  • ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি হলে বৃদ্ধি পাবে ৫৫ শতাংশ

ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি হবে।

নতুন বেতন স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো ‘প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতাও বাড়ানো হয়েছে। এতদিন কেবল পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাওয়ার আওতায় আসবেন।

নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।

এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে।

এসব নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান উল্লেখ থাকবে।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাকে অনুমোদিত বেতন স্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হবে।