ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি পর্যায়ে অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান বাঙালিকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। দ্রোহ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতার প্রশ্নে আপসহীন এই কবি আজও প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অন্যতম অনুপ্রেরণা।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে নিপীড়িত মানুষের অধিকার ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে সাহসী কণ্ঠে তুলে ধরেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সাহিত্যকর্মে অন্যায়ের প্রতিবাদ, শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আহ্বান ছিল স্পষ্ট ও আপসহীন। এ কারণে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর কবিতা ও গান নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে এসেছে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নজরুলের সৃষ্টি আন্দোলনকারীদের প্রেরণার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর সাহিত্য কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করেনি, বরং সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলের লেখনী ছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম। কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত পত্রিকার মধ্য দিয়ে তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানান তিনি। সেই সময়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলা ছিল অত্যন্ত সাহসী রাজনৈতিক অবস্থান।
পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। তবে কারাগারেও তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ থেমে থাকেনি। নজরুলের বিদ্রোহের উৎস ছিল নিপীড়িত মানুষের বঞ্চনা, অভিজ্ঞতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের ভূমিকা
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে উপমহাদেশে আন্দোলন যখন বিভিন্ন ধারায় বিস্তৃত হচ্ছিল, তখন নজরুল তাঁর সাহিত্যকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বানে পরিণত করেন। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার যে দৃঢ় ঘোষণা রয়েছে, তা পরাধীন মানুষের মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।
‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়োল্লাস’ ও ‘আনন্দময়ীর আগমনে’র মতো রচনায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, শৃঙ্খলমুক্তি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে। ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ গানটিও বন্দিত্ব ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়।
নজরুলের লেখাকে বিপজ্জনক বিবেচনা করে ব্রিটিশ সরকার তাঁর কয়েকটি রচনা বাজেয়াপ্ত করে এবং তাঁকে কারাবন্দি করে। কিন্তু দমন-পীড়নের মধ্যেও তাঁর প্রতিবাদী অবস্থান অটুট ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নজরুলের প্রেরণা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম একপর্যায়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশ নেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় নজরুলের স্বাধীনতাকামী চিন্তা, বিদ্রোহী উচ্চারণ এবং সাম্য ও মানবিকতার আদর্শ নতুন তাৎপর্য অর্জন করে। তাঁর গান ও কবিতা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করার যে আহ্বান তাঁর সৃষ্টিতে রয়েছে, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা
স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দল, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হন।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই আন্দোলনে প্রতিবাদী কবিতা, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা এ ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, শৃঙ্খল ভাঙা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান আন্দোলনকারীদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এ ঘটনা প্রমাণ করে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। নজরুলের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার এই প্রতিবাদী চেতনার অন্যতম সাংস্কৃতিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
জুলাইয়ের রাজপথে নজরুলের কবিতা ও গান
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ। শুরুতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের প্রকাশ হয়ে ওঠে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে গুম, খুন ও নিপীড়নের শিকার ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষও আন্দোলনে অংশ নেন।
আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নজরুলের কবিতা ও গান উচ্চারিত হয়েছে স্লোগান হিসেবে। ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ গানের শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করে।
নিপীড়নের শিকার মানুষ আত্মত্যাগের দৃঢ়তা নিয়ে রাজপথে নামলে নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা তাঁদের সাহস জোগায়। তাঁর ‘চির উন্নত মম শির’ কবিতার চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আবু সাঈদের মতো তরুণেরা অস্ত্রের সামনে দাঁড়ান।
আন্দোলনকারীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নজরুলের ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম’ গানটি সমস্বরে গেয়েছেন। গানটির নির্ভীকতা, স্বাধীনচেতা মনোভাব ও বন্ধনমুক্তির আহ্বান আন্দোলনের পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করে।
কারফিউ অমান্য করে রাজপথে নামা এবং ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থক ও নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার সময়ও নজরুলের গান-কবিতা আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
জুলাইয়ের গ্রাফিতিতে নজরুলের বিদ্রোহী উচ্চারণ
জুলাই আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার বিভিন্ন শক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করলে আন্দোলনকারীরা দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। এসব গ্রাফিতিতে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার পঙ্ক্তি বিশেষভাবে স্থান পায়।
দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয় তাঁর কবিতার সেই অগ্নিঝরা উচ্চারণ—‘আমি দুর্বার, আমি ভেঙে করি সব চুরমার!’ অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, প্রচলিত শৃঙ্খল ভাঙা এবং স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো এসব পঙ্ক্তি আন্দোলনকারীদের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর কাজী নজরুল ইসলামকে উপনিবেশবিরোধী সবচেয়ে বড় কবি বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘উপনিবেশের ধরন বদলেছে, কিন্তু শোষণের মাত্রা কমেনি। নজরুলের লেখা তাই বারবার ফিরে আসে। সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্যের কথাও নজরুলের লেখায় সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে।’
নজরুলের মানবিক দর্শন সম্পর্কে তারিক মনজুর বলেন, ইউরোপীয় দর্শনে একজন ব্যক্তি সভ্য গুণাবলি অর্জনের মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠে বলে বিবেচিত হলেও নজরুলের চিন্তায় বিষয়টি ভিন্ন। তাঁর মতে, জন্মগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই একজন মানুষ মানুষ হিসেবে স্বীকৃত। এর সঙ্গে অন্য কোনো পরিচয়ের সম্পর্ক নেই।
ব্যক্তির জাতি, ধর্ম, রীতি, সংস্কৃতি, দেশ, সম্পদ কিংবা আচরণ—কোনো কিছুই তার মানবিক পরিচয়ের পথে বাধা হতে পারে না। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র যখন মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে, তখন নজরুল সব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।
ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামে নজরুল সব সময় নিপীড়িত মানুষের পাশে রয়েছেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মানুষের পূর্ণ মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার আবেদন শেষ হবে না।
যুগে যুগে স্বৈরাচার, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদী চেতনায় কাজী নজরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চলমান সংগ্রামেও তাঁর সাম্য, মানবিকতা ও দ্রোহের আদর্শ প্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।