মঙ্গলের দুই উপগ্রহের রহস্য উন্মোচনে জাপানের অভিযান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০২:২৭ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
মঙ্গলগ্রহের দুই উপগ্রহ ফবোস ও ডিমোসের উৎপত্তির রহস্য উন্মোচনে ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) অভিযান পরিচালনা করছে জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা। এ অভিযানের লক্ষ্য ফবোসের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ২০৩১ সালের মধ্যে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, সংগৃহীত নমুনা মঙ্গলের উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি এবং লাল গ্রহের অতীত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে।
রেড প্ল্যানেট বা লাল গ্রহ হিসেবে পরিচিত মঙ্গলগ্রহের অনেক রহস্য এখনো অমীমাংসিত। এর মধ্যে অন্যতম হলো গ্রহটির দুই ছোট ও অনিয়মিত আকৃতির উপগ্রহ ফবোস ও ডিমোসের উৎপত্তি। দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চললেও উপগ্রহ দুটি কীভাবে মঙ্গলের কক্ষপথে এসেছে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।
এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সার নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে এমএমএক্স অভিযান। জাপানের কাগোশিমা প্রিফেকচারের তানেগাশিমা স্পেস সেন্টার থেকে এইচ-থ্রি রকেটে করে নভোযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এসা, ফ্রান্সের সিএনইএস এবং জার্মানির ডিএলআর এ অভিযানে প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা দিচ্ছে।
মিশনটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ফবোসের পৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১০ গ্রাম নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে এসব নমুনা পৃথিবীতে পৌঁছানোর কথা। সফল হলে মঙ্গলগ্রহের উপগ্রহ থেকে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে।
১৮৭৭ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিদ আসাফ হল মঙ্গলের উপগ্রহ দুটি আবিষ্কার করেন। রোমান যুদ্ধের দেবতা মার্সের পৌরাণিক পুত্র ফবোস ও ডিমোসের নামে এদের নাম রাখা হয়। ফবোস শব্দের অর্থ ভয়, আর ডিমোসের অর্থ আতঙ্ক।
ফবোস মঙ্গলের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। প্রতি ১০০ বছরে এটি গ্রহটির প্রায় ১ দশমিক ৮ মিটার কাছে চলে আসে বলে ধারণা করা হয়। বিজ্ঞানীদের অনুমান, আগামী পাঁচ কোটি বছরের মধ্যে উপগ্রহটি মঙ্গলের সঙ্গে সংঘর্ষে ধ্বংস হতে পারে অথবা ভেঙে গিয়ে গ্রহটিকে ঘিরে একটি বলয় তৈরি করতে পারে। ফবোসের পৃষ্ঠে রয়েছে প্রায় ছয় মাইল প্রশস্ত স্টিকনি নামের বিশাল গহ্বর। অন্যদিকে, তুলনামূলক ছোট ডিমোস মঙ্গল থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। এর পৃষ্ঠ অপেক্ষাকৃত মসৃণ এবং ধূলিকণায় আবৃত।
উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রধানত দুটি তত্ত্ব রয়েছে। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রাচীনকালে মঙ্গলের সঙ্গে কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষে ছিটকে বের হওয়া শিলা ও ধূলিকণা জমাট বেঁধে ফবোস ও ডিমোস তৈরি হয়েছিল। অন্য তত্ত্ব বলছে, গ্রহাণু বলয় থেকে আসা দুটি মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আটকা পড়ে উপগ্রহে পরিণত হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য কোনো তত্ত্বকেই পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গ্লাভিন এবং জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী অ্যাবিগেল ফ্রিম্যানের মতে, প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান উপাত্তের পুরোপুরি মিল নেই। এমএমএক্স মিশন থেকে পাওয়া নমুনা ও তথ্য এ বিতর্কের সমাধানে সহায়তা করতে পারে।
এমএমএক্স নভোযানটি প্রপালশন, এক্সপ্লোরেশন ও রিটার্ন—এই তিনটি মডিউল নিয়ে গঠিত। প্রায় এক বছর ভ্রমণের পর এটি মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে ফবোসকে পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি দূরের উপগ্রহ ডিমোসের ছবিও সংগ্রহ করবে।
মিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের শুরুর দিকে ‘আইডেফিক্স’ নামের প্রায় ২৫ কেজি ওজনের একটি রোভার ফবোসের পৃষ্ঠে নামানো হবে। উপগ্রহটির মহাকর্ষ অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় অবতরণের সময় রোভারটি পৃষ্ঠে ধাক্কা খেয়ে লাফিয়ে উঠতে পারে। রোভারটি বিভিন্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করে মূল নভোযানের জন্য নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবতরণস্থল চিহ্নিত করবে।
ফবোসের পৃষ্ঠে উজ্জ্বল ও অপেক্ষাকৃত অন্ধকার অঞ্চল রয়েছে। এ বৈচিত্র্যের কারণে উপগ্রহটির বিভিন্ন অংশের গঠন ও উপাদান নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে। জাক্সার বিজ্ঞানী তোমোহিরো উসুই জানিয়েছেন, মঙ্গলের দিকে মুখ করা অংশ এবং বিপরীত দিক—দুটি ভিন্ন স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
নমুনা সংগ্রহে নভোযানে দুটি পদ্ধতি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি ড্রিলের মাধ্যমে পৃষ্ঠের নিচ থেকে উপাদান সংগ্রহ করা হবে। অন্য পদ্ধতিতে গ্যাসের সাহায্যে উপরিভাগের ধূলিকণা সংগ্রহ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে নমুনাগুলো সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ করে পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে নভোযানটি।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এ অভিযান শুধু ফবোস ও ডিমোসের উৎপত্তি সম্পর্কে নয়, মঙ্গলগ্রহের অতীত সম্পর্কেও নতুন ধারণা দেবে। ফবোসের নমুনায় পানি বা জৈব যৌগের উপস্থিতি পাওয়া গেলে মঙ্গলের পরিবেশ ও রাসায়নিক বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে। নমুনায় অ্যামিনো অ্যাসিডসহ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাথমিক উপাদান রয়েছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মঙ্গলগ্রহ ও তার উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এমএমএক্স অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মিশনটি সফল হলে সৌরজগতের গঠন, মঙ্গলের ইতিহাস এবং জীবনের উপযোগী পরিবেশের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণায় নতুন তথ্য যুক্ত হবে।