• ২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেনাপোল বন্দরের আলোচিত কর্মকর্তা রনির বদলি, আদেশ বাতিলে তৎপর সিন্ডিকেটের অভিযোগ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত জুলাই ২৫, ২০২৬, ২১:২৭ অপরাহ্ণ
বেনাপোল বন্দরের আলোচিত কর্মকর্তা রনির বদলি, আদেশ বাতিলে তৎপর সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সংবাদটি শেয়ার করুন....

দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরের আলোচিত ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান (রনি)-কে হিলি স্থলবন্দরে বদলির আদেশ দিয়েছে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বদলির আদেশ জারির পরপরই তা বাতিল করতে একটি প্রভাবশালী চক্র তৎপর হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত গত ২৩ জুলাইয়ের এক আদেশে আশিকুর রহমান রনিকে বেনাপোল থেকে হিলি স্থলবন্দরে বদলি করা হয়।

বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, শুধু বদলি করলেই বন্দরের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হবে না। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে অবৈধ সম্পদ জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে এক বছরের বেশি সময় ধরে একই বন্দরে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলির দাবি জানিয়েছেন তারা।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে আমদানি হওয়া পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের সময় প্রথমে ট্রাকসহ মোট (গ্রোস) ওজন এবং পণ্য খালাসের পর খালি ট্রাকের ওজন নিয়ে নিট ওজন নির্ধারণ করা হয়। এই ওজনের ভিত্তিতেই শুল্ক নির্ধারণে প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহার করা হয়। সম্প্রতি কয়েকটি চালানে ওজনের অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় কাস্টমস।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ এপ্রিল রোকেয়া ট্রেডার্স ভারত থেকে আঙ্গুর আমদানি করে। অভিযোগ রয়েছে, ওই চালানের খালি ট্রাকের প্রকৃত ওজন ছিল ১৩ হাজার ৩১০ কেজি। কিন্তু ওজন স্লিপে তা ১৩ হাজার ৮৮০ কেজি দেখানো হয়। এতে ৫৭০ কেজি অতিরিক্ত ওজন দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একই ওজন স্লিপ ব্যবহার করে ভবিষ্যতের চালানেও রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ নেওয়া হতে পারে। ওই ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

এদিকে গত ১৪ জুন সহকারী কমিশনার অব কাস্টমস অটল গোস্বামীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বন্দরের ৫ নম্বর ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই সময়ে একই ভারতীয় ট্রাকের দুটি ভিন্ন খালি ওজন প্রদর্শনের তথ্য উঠে আসে। এক নথিতে ট্রাকটির ওজন ৪ হাজার ৮৮০ কেজি এবং অন্যটিতে ৪ হাজার ৯২০ কেজি উল্লেখ ছিল। পরে ২৫ জুন কাস্টমস সংশ্লিষ্ট চালানটি আটক করে তদন্ত শুরু করে। তবে তদন্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উচ্চ শুল্কযুক্ত কিছু পণ্য বন্দরের একই শেডের বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ধাপে ধাপে সেগুলো খালাস করা হয়। এ ধরনের অনিয়মে কিছু শেড ইনচার্জের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, পচনশীল পণ্যের স্কেলে ওজন কারসাজির মাধ্যমে ট্রাকপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের বিনিময়ে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা বাড়ার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা।

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত বছরের ৫ আগস্টের পর বন্দরের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কিছু সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের যোগসাজসে একটি ওজন কারসাজি চক্র সক্রিয় রয়েছে। চিহ্নিত ট্রাকগুলোর ওজনের ইতিহাস ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে গত ১২ মার্চ বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকার উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য জব্দ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পরে বন্দরের জিম্মায় থাকা ওই চালান রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায় এবং সেখানে নিম্নমানের দেশীয় পণ্য রাখা হয়।

এ ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম-১, ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি এবং অন্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে যোগসাজসের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, জাল নথিপত্র তৈরি ও ওজন কারসাজির মাধ্যমে পণ্য খালাসে তারা ভূমিকা রাখেন। এ ঘটনায় গত ৯ জুন কাস্টমস বাদী হয়ে ১০ জনের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন, ২০২৩ এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি। তিনি বলেন, “আমি পচনশীল পণ্যের স্কেলে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করি। ওজনের যে অসঙ্গতির কথা বলা হচ্ছে, তা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হয়েছে।”

এদিকে বন্দর-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বদলির আদেশ বাতিলের জন্য একটি প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালাচ্ছে। এমনকি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়েও লবিং চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।