• ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিহ্যাব: একটি নির্বাচন, নাকি পুরোনো রোগের পুনরাবৃত্তি?

— এম.জি.আর নাসির মজুমদার

মতামত ডেস্ক
প্রকাশিত এপ্রিল ২২, ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
রিহ্যাব: একটি নির্বাচন, নাকি পুরোনো রোগের পুনরাবৃত্তি?
সংবাদটি শেয়ার করুন....

বাংলাদেশের আবাসন খাত এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী সংকটে জর্জরিত—উচ্চ নির্মাণ ব্যয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা, ক্রেতা সংকট এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা। এই প্রেক্ষাপটে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর নির্বাচন ছিল আশার একটি জানালা। দীর্ঘদিন পর একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন—হয়তো সংগঠনটি এবার নিজেকে পুনর্গঠনের পথে হাঁটবে।

কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।

নির্বাচন শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিনের মধ্যেই যে চিত্র সামনে এসেছে, তা কোনোভাবেই আশাব্যঞ্জক নয়; বরং এটি আমাদের সংগঠন সংস্কৃতির গভীর অসুখকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ফলাফল ঘোষণায় অযৌক্তিক বিলম্ব, পর্দার আড়ালে দেনদরবার, পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অপচেষ্টা—এসবই ইঙ্গিত দেয়, আমরা এখনো গণতন্ত্রকে প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করলেও, মানসিকভাবে তা ধারণ করতে পারিনি।

প্রশ্নটি সরল, কিন্তু অস্বস্তিকর—যে নির্বাচন সবার সামনে স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠিত হলো, সেটিকে বিতর্কিত করার প্রয়োজন কেন? এই অপচেষ্টার পেছনে কার স্বার্থ কাজ করছে?

বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়িক সংগঠনের মতো রিহ্যাবও যেন একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতির মধ্যে আটকে গেছে—“জিতলে নির্বাচন সঠিক, হারলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ।” এই মানসিকতা শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, আত্মঘাতীও বটে। কারণ, এতে করে ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনই আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।

আরও উদ্বেগজনক হলো—একটি ব্যবসায়িক সংগঠন হয়েও এখানে রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের প্রবণতা বাড়ছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত মতাদর্শের ভিত্তিতে চিহ্নিত করার চেষ্টা, কিংবা সংগঠনের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন টেনে আনা—এসব আচরণ রিহ্যাবকে তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করছে। এটি কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়; এটি একটি পেশাদার প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সদস্যদের স্বার্থই হওয়া উচিত একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।

এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে সাধারণ সদস্যদের। ইতোমধ্যে অনেকে হতাশা প্রকাশ করছেন, কেউ কেউ সংগঠন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথাও বলছেন। একটি সংগঠনের জন্য এর চেয়ে বড় সতর্ক সংকেত আর কী হতে পারে?

অথচ এই নির্বাচন আমাদের সামনে একটি ইতিবাচক বার্তাও দিয়েছিল। সাধারণ সদস্যরা আর আগের মতো নন—তারা সচেতন, তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে চান, তারা যোগ্য নেতৃত্ব দেখতে চান। এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো এবং তা ধরে রাখা ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু আমরা কি সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছি?

এখন প্রয়োজন কঠিন কিন্তু জরুরি কিছু সিদ্ধান্ত।

প্রথমত, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতন্ত্রে পরাজয় কোনো অপমান নয়; বরং সেটি ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা এবং যেকোনো আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রিভিউ ব্যবস্থা থাকা উচিত। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা পুনর্গঠন করতে না পারলে এই সংকট কাটবে না।

তৃতীয়ত, সংগঠনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। “ব্যবসা আগে, রাজনীতি বাইরে”—এই নীতিকে শুধু মুখে নয়, বাস্তবেও প্রয়োগ করতে হবে।

চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মামলা-মোকদ্দমার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একটি পরিণত সংগঠনে সমস্যা সমাধান হয় আলোচনার মাধ্যমে, আদালতের মাধ্যমে নয়।

সবশেষে, রিহ্যাবের নেতৃত্বকে বুঝতে হবে—এটি কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি একটি সেক্টরের সম্মিলিত প্রতিনিধি। এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর স্বার্থই অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা।

আজ রিহ্যাব একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—সংগঠনটি কি আবারও পুরোনো অস্থিরতার চক্রে আটকে থাকবে, নাকি একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও সদস্যকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে।

প্রশ্নটি তাই শুধু নেতৃত্বের প্রতি নয়—সকল সদস্যের প্রতিও।

আমরা কি সত্যিই পরিবর্তন চাই,
নাকি পরিবর্তনের কথা বলেই সন্তুষ্ট থাকতে চাই?

লেখক:
এম.জি.আর নাসির মজুমদার, সিআইপি
উদ্যোক্তা ও সাবেক পরিচালক, এফবিসিসিআই
সদস্য, রিহ্যাব