কোয়ার্টজ পাউডারের আড়ালে ভায়াগ্রার কাঁচামাল, বেনাপোল বন্দরে জব্দের পর ২৪ ঘণ্টা বিশেষ নিরাপত্তা
বেনাপোল শার্শা যশোর
প্রকাশিত জুলাই ১২, ২০২৬, ০০:১৭ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
পরীক্ষাগারে মিলল সিলডেনাফিল সাইট্রেটসহ বিপুল পরিমাণ ওষুধের কাঁচামাল; পাচারের আশঙ্কায় শেডজুড়ে কড়া নজরদারি
ভারত থেকে ‘কোয়ার্টজ পাউডার’ ঘোষণা দিয়ে আনা একটি আমদানি চালানে বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রার কাঁচামাল (সিলডেনাফিল সাইট্রেট) ও বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ওষুধের অননুমোদিত কাঁচামাল জব্দ করেছে বেনাপোল কাস্টমস। উচ্চমূল্যের এই চালান অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় বন্দরের সংশ্লিষ্ট পণ্যগারে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কাস্টমসের লিখিত অনুরোধের পর বন্দর কর্তৃপক্ষ আনসার, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী ও নিজস্ব গোয়েন্দা সদস্যদের সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করেছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ১৫ মার্চ ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের মেসার্স আরাফাত এন্টারপ্রাইজ ভারত থেকে প্রায় ১৬ টন পণ্য আমদানি করে। আমদানি ঘোষণাপত্রে পণ্যের নাম উল্লেখ করা হয় ‘কোয়ার্টজ পাউডার’। চালানটির খালাস কার্যক্রম পরিচালনা করছিল হায়দার অ্যান্ড সন্স নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তারা বন্দরের ৩২ নম্বর শেডে রাখা চালানটির ওপর নজরদারি বাড়ান। পরে কায়িক পরীক্ষা এবং পরীক্ষাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণে ঘোষণাবহির্ভূত বিপুল পরিমাণ ওষুধের কাঁচামাল ও রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
জব্দ করা চালানে রয়েছে ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি সিলডেনাফিল সাইট্রেট (ভায়াগ্রার কাঁচামাল), ৮ হাজার ২০০ কেজি কোয়ার্টজ পাউডার, ১২০ কেজি ম্যাগনেসিয়াম স্টিয়ারেট, ৪৯৫ কেজি এটোরিকক্সিব, ১৮০ কেজি হাইড্রোকুইনোন, ২ হাজার ১৫০ কেজি ওমিপ্রাজল/এসোমিপ্রাজল ম্যাগনেসিয়াম ট্রাইহাইড্রেট, ৪০ কেজি মন্টেলুকাস্ট সোডিয়াম, ১০০ কেজি রিবোফ্লাভিন সোডিয়াম ফসফেট, ২৫ কেজি ডমপেরিডন/প্যারাসিটামল, ৩৫০ কেজি সেফট্রিয়াক্সন সোডিয়াম, ১০০ কেজি ক্যাফেইন এবং ৫০ কেজি স্যালিসিলিক অ্যাসিড।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, জব্দ করা চালানটি নিয়ে আইনি কার্যক্রম চলমান। তবে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, একটি চক্র কাস্টমসের নজর এড়িয়ে চালানটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই নিরাপত্তা জোরদারের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কাস্টমসের চিঠি পাওয়ার পর ৩২ নম্বর শেডে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে। আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান আল-আরাফাতের কর্মী এবং বন্দরের গোয়েন্দা সদস্যরা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি বন্দরের আরেকটি শেডে দীর্ঘদিন ধরে জব্দ থাকা ভায়াগ্রা সন্দেহভাজন একটি চালানেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অত্যাধুনিক স্ক্যানিং সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ও নিষিদ্ধ পণ্য আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রায় ১৫ কোটি টাকার আমদানি পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তাকর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকসহ ৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, এ ধরনের নিয়ন্ত্রিত ওষুধের কাঁচামাল দেশের বাজারে প্রবেশ করলে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ ঘটনায় জড়িতদের পাশাপাশি সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কর্মকাণ্ডের কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এতে অনেক ব্যবসায়ী বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি কমিয়ে অন্য বন্দর ব্যবহারের কথা ভাবছেন।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বলেন, কাস্টমসের অনুরোধ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শেডগুলোতে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। জব্দ করা চালানগুলোর নিরাপত্তায় আনসার, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী ও বন্দরের গোয়েন্দা সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের শিথিলতার সুযোগ রাখা হচ্ছে না।
এর আগে ২০১৯ সালের ২৬ মে সোডিয়াম গ্লাইকুলেট ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা একটি চালানে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর ২ হাজার ৭০০ কেজি ভায়াগ্রার কাঁচামাল শনাক্ত হয়েছিল। সেই চালানটিও এখন পর্যন্ত বন্দরের ৩৪ নম্বর শেডে সংরক্ষিত রয়েছে।