• ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আবাসন খাতের সংকট: টেকসই সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই

উচ্চ সুদ, ড্যাপ জটিলতা ও নির্মাণ ব্যয়ের চাপে স্থবির বাজার; পুনরুজ্জীবনে সরকার, ব্যাংক, ডেভেলপার ও নগর বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত ভূমিকার আহ্বান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত মে ৯, ২০২৬, ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ
আবাসন খাতের সংকট: টেকসই সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই
সংবাদটি শেয়ার করুন....

দেশের আবাসন খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফ্ল্যাট বুকিং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে প্রায় ২৬ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশের জিডিপিতে প্রায় ১০ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতের স্থবিরতা এখন শুধু ব্যবসায়িক সংকট নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও নগর জীবনের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এম,জি,আর নাসির মজুমদার, যিনি একজন উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী ও নীতি বিশ্লেষক—তিনি আবাসন খাতের বর্তমান বাস্তবতা, সংকট ও উত্তরণের পথ নিয়ে এক বিশদ বিশ্লেষণে বলেন, আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে প্রায় ২০০টিরও বেশি শিল্প ও সেবা খাত। রড, সিমেন্ট, সিরামিক, গ্লাস, কেবল, ফার্নিচার, ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহন ও কর্মসংস্থানসহ বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, বর্তমানে হোম লোনের সুদের হার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো নতুন প্রকল্প ঋণ প্রদানে অনীহা দেখাচ্ছে। ড্যাপ (DAP) ও FAR সংক্রান্ত জটিলতা বিনিয়োগ পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

অন্যদিকে রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় অনেক ক্রেতা বুকিং বাতিল করায় ডেভেলপারদের ক্যাশ ফ্লো সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের ভূমিকাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ব্যয়, কর ও ভ্যাট সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রেশন খরচ সাধারণ মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনাকে কঠিন করে তুলেছে।

এছাড়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ রি-ফাইন্যান্সিং স্কিম চালু করা গেলে আবাসন বাজারে ইতিবাচক গতি ফিরে আসতে পারে।

ড্যাপ (DAP), FAR ও ভবন নির্মাণসংক্রান্ত নীতিমালায় বাস্তবভিত্তিক ও অংশীজনভিত্তিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বার্থ রক্ষা করেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে বলে মত দেন তিনি।

পাশাপাশি প্ল্যান পাস, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ ও অন্যান্য অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও অযৌক্তিক ব্যয় কমাতে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর দাবিও জানান তিনি।

বিশ্লেষণে বলা হয়, রিহ্যাব ও বিএলডিএ শুধু ব্যবসায়ী সংগঠন নয়; আবাসন খাতের নীতিগত নেতৃত্বও তাদের দিতে হবে।

তাদের করণীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়—

  • সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কার্যকর ও ধারাবাহিক সংলাপ বজায় রাখা
  • ড্যাপ ও FAR সংক্রান্ত জটিলতার যৌক্তিক সমাধানে বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রদান
  • ছোট ও মাঝারি ডেভেলপারদের স্বার্থ সংরক্ষণ
  • নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তরে সদস্যদের কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করা
  • বাজারে ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা

এছাড়া বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী ও অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে স্থায়ী গবেষণা ও সুপারিশ কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়।

নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও পরিবেশবিদদের দায়িত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ও টেকসই নগর গঠনে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের দায়িত্ব হওয়া উচিত—

  • বাস্তবভিত্তিক ও ভবিষ্যতমুখী নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন
  • খাল, জলাধার, সবুজ এলাকা ও কৃষিজমি সংরক্ষণ নিশ্চিত করা
  • যানজট ও পরিবেশগত ভারসাম্য বিবেচনায় উন্নয়ন পরিকল্পনা দেওয়া
  • ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা ও নগর সম্প্রসারণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা

বর্তমানে উচ্চ সুদের হারকে আবাসন খাতের অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবাসন খাতকে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করণীয় হিসেবে বলা হয়—

  • হোম লোনের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা
  • প্রকল্প ঋণ প্রদানে অতিরিক্ত কঠোরতা কমানো
  • প্রথমবার ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করা
  • কিস্তি পরিশোধে নমনীয়তা ও পুনঃতফসিল সুবিধা বৃদ্ধি করা

তার মতে, আবাসন খাত সচল থাকলে ব্যাংকিং খাতও দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে।

বর্তমান বাস্তবতায় ডেভেলপারদের ব্যবসায়িক কৌশলেও পরিবর্তন আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। শুধু বিলাসবহুল প্রকল্প নয়, মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছোট ও মাঝারি আকারের ফ্ল্যাট নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে—

  • সময়মতো প্রকল্প হস্তান্তর নিশ্চিত করা
  • জমির আইনি বৈধতা ও অনুমোদনে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা
  • পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি করা
  • গ্রাহকের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা

এসব উদ্যোগ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

বিশ্লেষণে ক্রেতাদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। শুধুমাত্র কম দামের বিজ্ঞাপন দেখে বিনিয়োগ না করে—

  • ডেভেলপারের সুনাম, সামর্থ্য ও পূর্ব অভিজ্ঞতা যাচাই
  • রাজউকসহ সকল অনুমোদন পরীক্ষা
  • জমির আইনি বৈধতা নিশ্চিত করা
  • প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা

এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

পাশাপাশি ক্রেতাদের সংগঠিতভাবে স্বল্পসুদে গৃহঋণ ও যৌক্তিক কর-সুবিধার দাবিও উত্থাপন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সবশেষে এম,জি,আর নাসির মজুমদার বলেন, আবাসন খাতের বর্তমান সংকট কেবল একটি ব্যবসায়িক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, পরিবেশ ও নগর জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

তিনি মনে করেন, সরকার, রিহ্যাব, বিএলডিএ, ব্যাংক, ডেভেলপার, ক্রেতা, প্রকৌশলী, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনকে সমন্বিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই আবাসন খাত আবারও দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।