• ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তেলের আকাশচুম্বী দামে থমকে গেল আজীবন সমুদ্রে থাকার স্বপ্ন

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ১৪:৩২ অপরাহ্ণ
তেলের আকাশচুম্বী দামে থমকে গেল আজীবন সমুদ্রে থাকার স্বপ্ন
সংবাদটি শেয়ার করুন....

জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাড়ে তিন বছরের বিশ্বভ্রমণ স্থগিত করেছে বিলাসবহুল আবাসিক ক্রুজ ‘ভিলা ভি অডিসি’। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দরে নোঙর করা জাহাজটিতে থাকা প্রায় ২০০ যাত্রীর দীর্ঘদিন সমুদ্রে বসবাসের স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। জাহাজটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের কারণে তাদের পক্ষে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

মার্কিনভিত্তিক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ভিলা ভি রেসিডেনসেস মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানায়, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তাদের ব্যবসায়িক পরিচালন মডেল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়ে জাহাজটির পরিচালন ব্যয়ে।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজটির জ্বালানি খরচ ৩০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আগে প্রতি কেবিনের জন্য মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ডলার জ্বালানি ব্যয় হতো। বর্তমানে এশীয় অঞ্চলে চলাচলের সময় সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার ডলারে। এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে না পেরে বিশ্বভ্রমণ কার্যক্রম স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দরে জাহাজটি নোঙর করার পর যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। জাহাজটিতে ১৫টি দেশের প্রায় ২০০ জন যাত্রী ছিলেন, যাঁদের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এ ছাড়া সেখানে ১৫৬ জন ক্রু সদস্যও ছিলেন।

হঠাৎ করে যাত্রা স্থগিতের সিদ্ধান্তে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তাঁদের অনেকে জমিজমা ও বাড়িঘর বিক্রি করে সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে জাহাজটিতে বসবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। সমুদ্রের বুকে ভাসমান এই বিলাসবহুল জাহাজকেই তাঁরা স্থায়ী আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু কম্বোডিয়ার বন্দরে এসে তাঁদের সেই পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ভিলা ভি রেসিডেনসেসের প্রতিষ্ঠাতা মিকেল পেটারসন জানিয়েছেন, যাত্রীদের কম্বোডিয়ায় সাময়িক আবাসনের জন্য হোটেল ভাড়া এবং স্থানীয় যাতায়াতের খরচ বহন করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে নিজ নিজ দেশে ফেরার আন্তর্জাতিক বিমানভাড়া বা অন্যান্য ভ্রমণ ব্যয় কোম্পানি বহন করবে না।

পেটারসন আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, সংকট কাটিয়ে নতুন অঞ্চলে জাহাজ পরিচালনার জন্য যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জ্বালানি ব্যয় সামাল দিতে প্রতি কেবিনে মাসিক অতিরিক্ত ৫০০ ডলার ফি এবং পৃথক জ্বালানি সারচার্জ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে যাত্রীদের একটি বড় অংশ বাড়তি খরচ দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

জাহাজটির কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে নতুন অর্থায়নের সন্ধান করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে কবে নাগাদ জাহাজটি কম্বোডিয়ার বন্দর ছেড়ে আবার যাত্রা শুরু করতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সাধারণ পর্যটকবাহী ক্রুজের সঙ্গে ‘ভিলা ভি অডিসি’র মূল পার্থক্য ছিল এর দীর্ঘমেয়াদি আবাসনব্যবস্থা। কয়েক দিন বা সপ্তাহের ছুটির বদলে এতে দীর্ঘ সময়, এমনকি আজীবন বসবাসের সুযোগ রাখা হয়েছিল। সমুদ্রে বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য জাহাজটিতে সুইমিং পুল, রেস্তোরাঁ, বার, জিম ও পিকলবল কোর্টসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল।

জাহাজটির কেবিনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত। মাসিক খরচের বিনিময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ থাকায় এটি বিশেষ করে প্রবীণ ও সচ্ছল পর্যটকদের আকৃষ্ট করেছিল।

সাড়ে তিন বছরে বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশ ভ্রমণের লক্ষ্য নিয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট থেকে জাহাজটির যাত্রা শুরু হয়। তবে শুরুতেই দীর্ঘ সময় মেরামতের প্রয়োজন হওয়ায় বেলফাস্টে কয়েক মাস আটকে থাকতে হয়েছিল জাহাজটিকে। এতে কোম্পানির আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়।

পরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, তোঙ্গা ও অস্ট্রেলিয়া ঘুরে এশিয়ায় পৌঁছায় জাহাজটি। শেষ পর্যন্ত জ্বালানি ব্যয়ের চাপেই এর বিশ্বভ্রমণ থেমে গেছে। যাত্রীদের ভবিষ্যৎ এবং অসমাপ্ত বিশ্বভ্রমণ নিয়ে ‘ভিলা ভি অডিসি’ এখন কম্বোডিয়ার উপকূলে অনিশ্চিত অপেক্ষায় রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি, ব্লুমবার্গ