• ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাপান সফরে একাধিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা প্রধানমন্ত্রীর

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০৩:৪০ পূর্বাহ্ণ
জাপান সফরে একাধিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা প্রধানমন্ত্রীর
সংবাদটি শেয়ার করুন....

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা করা হচ্ছে। কৃষি, মৎস্য, দক্ষতা উন্নয়ন, বাণিজ্য, পরিবেশ ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রাধিকার তুলে ধরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রায় আটটি দলিল চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তবে আলোচনা শেষে কতটি দলিল সই হবে, তা নির্ধারিত হবে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, সফরকালে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলোর অনেকগুলো সই হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। যৌথ বিবৃতিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলাফল এবং বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরা হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত দলিলগুলোতে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয় রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, প্রস্তাবিত চুক্তিগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে জাপানের শিল্প-অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতে পারে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে নতুন গতি সঞ্চারের সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলো উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত খাতগুলোতে সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।

অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মীদের জন্য উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

জাপানি বিনিয়োগের উদ্যোগে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন সাবেক উপাচার্য। তাঁর মতে, বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের মাঝারি আকারের কোম্পানি ও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তুললে দেশীয় সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উপকৃত হতে পারে। এতে উৎপাদন পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নতির সুযোগ তৈরি হবে।

সফর শেষে একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, এতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, সমঝোতা স্মারক সই গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল নির্ভর করবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায়, তার ওপর।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। দুই নেতা নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।

সফরকালে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন তারেক রহমান। এ ছাড়া জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সুযোগ ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে।

এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

প্রস্তাবিত সফরসূচিতে চিবা অঞ্চলের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ার একটি টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা সফর করবেন। প্রতিনিধিদল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে জাপান যাবে।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পাশাপাশি চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়া এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বাস্তব চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হবে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, আলোচনায় চুক্তি বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

ঢাকার এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ৮৩ শতাংশ এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়নের শর্তও আলোচনায় আসতে পারে।

ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাপানি ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে আলোচনা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সিয়াম বলেন, বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনায় আসবে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, আলোচনা শুধু মেট্রোরেল প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

সিয়াম বলেন, বাংলাদেশ সব দেশ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চায়। তবে বৈশ্বিক অর্থায়নব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিভিন্ন বিষয় আলোচনার ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।

বাংলাদেশে মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে জাপান সহায়তা করছে।

২০১৪ সালে চালু হওয়া ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ অবকাঠামো, শিল্প ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরির কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।

অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, মাতারবাড়ী ও আড়াইহাজারে অবকাঠামো বিনিয়োগের সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, স্থানীয় সরবরাহকারী এবং কর্মসংস্থানের সংযোগ ঘটানোর সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, প্রস্তুত জমি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, উন্নত পরিবহন যোগাযোগ এবং অনুমোদনের পূর্বানুমেয় প্রক্রিয়া বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে কার্যকর ব্যবসায় রূপ দিতে সহায়তা করবে।

পররাষ্ট্র সচিব জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নও আলোচনার বিষয় হবে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও দুই দেশের আলোচনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়গুলো স্থান পাবে।

দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভিত্তিতে সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে তোলা, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব আরও এগিয়ে নেওয়াই এ সফরের লক্ষ্য।