বেনাপোল ট্রাজেডির ১২ বছর এক যুগ পরও থামেনি আহাজারি, অবহেলায় স্মৃতিস্তম্ভ
বেনাপোল প্রতিনিধি ॥
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১৫:২২ অপরাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
সীমান্ত শহর বেনাপোলের জন্য দিনটি গভীর শোকের। ২০১৪ সালের এই দিনে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী। ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের চোখের জল শুকায়নি; সহপাঠী হারানোর বেদনা আজও ভারী হয়ে আছে পুরো এলাকায়।
২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেহেরপুরের মুজিবনগরে শিক্ষা সফর শেষে বাসে করে ফিরছিল। রাত আনুমানিক আটটার দিকে চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের চৌগাছার ঝাউতলা কাঁদবিলা এলাকায় শিক্ষার্থীবাহী বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে ৯ শিক্ষার্থী প্রাণ হারায়। আহত হয় অন্তত ৮০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক।
নিহতরা সবাই তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ছিলেন ছোটআঁচড়া গ্রামের সৈয়দ আলীর দুই মেয়ে—পঞ্চম শ্রেণির সুরাইয়া ও তৃতীয় শ্রেণির জেবা আক্তার; একই গ্রামের ইউনুস আলীর মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির মিথিলা আক্তার; রফিকুল ইসলামের মেয়ে চতুর্থ শ্রেণির রুনা আক্তার মীম; লোকমান হোসেনের ছেলে চতুর্থ শ্রেণির শান্ত; গাজিপুর গ্রামের সেকেন্দার আলীর ছেলে পঞ্চম শ্রেণির সাব্বির হোসেন; নামাজ গ্রামের হাসান আলীর মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির আঁখি; ছোটআঁচড়ার মনির হোসেনের ছেলে পঞ্চম শ্রেণির ইকরামুল এবং একই গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে পঞ্চম শ্রেণির ইয়ানুর রহমান।
এক শোকাহত অভিভাবক বলেন, “সেই দিনের স্মৃতি আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। আমরা আমাদের সন্তানদের হারিয়েছি, কিন্তু এই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।”
প্রতি বছর এ দিনে বিদ্যালয়ে শোকসভা, মিলাদ মাহফিল এবং স্কুলের সামনে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা দিনটিকে ‘বেনাপোল ট্রাজেডি দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন। যশোরের চৌগাছা ও শার্শা উপজেলার বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন কালো পতাকা উত্তোলন, শোক র্যালি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে থাকে।
তবে এ বছর সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয় চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচির আয়োজন চোখে পড়েনি। পাশের মরিয়ম মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে তাদের পক্ষ থেকে শহীদ ৯ শিশুর স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করেছিল। কিন্তু নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে এ বছর কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি বলে তিনি জানান।
এদিকে বেনাপোল পৌরসভার উদ্যোগে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা। সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানটি পরিচর্যার অভাবে মলিন; চারপাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। স্মৃতিচিহ্নটি যেন অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
নিহত শিশুদের অভিভাবকেরা স্মৃতিস্তম্ভে রংয়ের কাজ ও নিয়মিত পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁদের দাবি, শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়—শিশুদের স্মৃতি সংরক্ষণে চাই স্থায়ী ও যত্নশীল উদ্যোগ।
এক যুগ আগে ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনা বেনাপোলবাসীর মনে আজও তাজা ক্ষত। সময় গড়িয়েছে, কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি এলেই সীমান্ত শহরটি ফিরে যায় এক বিষাদময় রাতে।