সার উৎপাদন বাড়াতে তিন নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের
ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া, চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ টন টিএসপি ও পলাশে ২৪ হাজার টন ইউএফ-৮৫ উৎপাদনের উদ্যোগ; লক্ষ্য ২৭ লাখ টন সার উৎপাদন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ৭, ২০২৬, ০১:১২ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
দেশে সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন তিনটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি এবং নরসিংদীর পলাশে বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশে সার উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে সারের সরবরাহ জোরদার এবং শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির অধীনে বর্তমানে সাতটি সার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া এবং দুটি নন-ইউরিয়া সার কারখানা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে উৎপাদিত হয়েছে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
একই অর্থবছরে দেশে টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদা ছিল যথাক্রমে ৭ লাখ ৫০ হাজার এবং ১৪ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে যথাক্রমে ৬৮ হাজার ২৫৯ ও ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদার মাত্র ৯ দশমিক ১০ ও ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ হয়েছে। বাকি চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, সরকার প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া সারে ২৩ হাজার টাকা, টিএসপিতে ৪৯ হাজার ১৭০ টাকা এবং ডিএপি সারে ৯৮ হাজার ৮৪০ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। ভর্তুকির চাপ কমানো, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং সার সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ভোলায় নতুন ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটিতে দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভোলায় প্রস্তাবিত ইউরিয়া সার কারখানা নির্মিত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি প্রস্তুতি, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফসফেটজাত সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় টিএসপিসিএল কমপ্লেক্সের অব্যবহৃত জায়গায় নতুন টিএসপি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৪ লাখ মেট্রিক টন।
বর্তমানে বিসিআইসির টিএসপি কমপ্লেক্সে কাঁচামালের সংকট ও প্ল্যান্টের সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন কারখানা স্থাপন করা গেলে টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বাসসকে বলেন, টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান বাড়বে।
নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসির অব্যবহৃত জায়গায় বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতার ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ও অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পপণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। পলাশে প্রস্তাবিত ইউএফ-৮৫ কারখানার ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রযুক্তি, বাজার চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
নতুন তিনটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ শ্রমিক ও পরিচালনাকর্মীদের পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিল্প অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, নতুন কারখানা স্থাপনের ফলে নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে কতজনের কর্মসংস্থান হবে, তা প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা, উৎপাদন প্রযুক্তি ও জনবল কাঠামো নির্ধারণের পর বলা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প খাতে দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে বিসিআইসি।