“শুধু রাজনীতিতে নয়, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র প্রয়োজন”; তরুণ উদ্যোক্তা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে জোর
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত মে ১০, ২০২৬, ২৩:১৯ অপরাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের প্রতিটি নাগরিক যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে, সেজন্য বাংলাদেশকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে “বাংলাদেশের গল্প” বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে সব অংশীজনের সম্মিলিত সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
রোববার রাজধানীর পিকেএসএফ মিলনায়তনে রেইজ-২ প্রকল্পের ‘স্টেপিং ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “শুধু রাজনীতিতে গণতন্ত্র থাকলেই হবে না, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র থাকতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং এর সুফল পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে।”
অনুষ্ঠানে পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বিশ্বব্যাংক-এর বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় পরিচালক ড. গেইল মার্টিন। এছাড়া স্বাগত বক্তব্য দেন পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।
তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে পিকেএসএফ-এর ভূমিকার প্রশংসা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করছে। বিনিয়োগের বিপরীতে আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “করদাতাদের অর্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যয় করতে হবে। কোনো প্রকল্প জনগণের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা বিবেচনায় নিয়েই অনুমোদন দেওয়া হবে।”
সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে সামাজিক কর্মসূচি ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে গোষ্ঠীনির্ভর ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের বাইরে ছিল, ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন জনবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, “নারীরা পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও অনেক সময় তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি মেলে না। এই কর্মসূচির আওতায় নারীদের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে, যা তাদের ক্ষমতায়ন বাড়াবে।”
স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় এখনও অনেক বেশি। তাই সরকার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার দিকে এগোচ্ছে এবং আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের জনমিতিক সুফল কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পী, কুটির শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তিনি জানান, কারুশিল্পীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, নকশা উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ ধারণার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, শীতলপাটির মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্যে বিশেষায়িত গ্রামগুলোকে ঋণ, প্রশিক্ষণ, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন বিপণন সহায়তা দেওয়া হবে। এতে স্থানীয় আয় ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়বে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত রেইজ প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও দুই লাখ তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ চর, হাওর, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকার তরুণদের পাশাপাশি দলিত জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী তরুণদেরও এই প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
নারীদের কর্মসংস্থান বাড়াতে ১ হাজার ৬শ’ নারীকে ‘হোম-বেইজড চাইল্ডকেয়ার’ উদ্যোক্তা হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৪ লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি এ প্রকল্পের সুফল ভোগ করবেন এবং এটি টেকসই কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।