প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধে বিকল্প আয়ের উদ্যোগে বেড়েছে দেশীয় মাছের উৎপাদন, বদলেছে হাজারো জেলে পরিবারের জীবন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত মে ১৩, ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা করতে নদী-খাল-বিলে যখন চলছে প্রজনন মৌসুম, তখন জাল ফেলে জীবিকার পথ বদলেছেন হাজারো দরিদ্র মৎস্যজীবী। কারও ঘরে এখন ছাগলের খামার, কেউ পালন করছেন বকনা বাছুর, আবার কেউ ভ্যান চালিয়ে টিকিয়ে রেখেছেন সংসার। সরকারের একটি বিশেষ প্রকল্প শুধু মাছই বাঁচায়নি, বদলে দিয়েছে জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকাও।
১৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের জুলাইয়ে মৎস্য অধিদপ্তর-এর আওতায় শুরু হয় ‘দেশীয় মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্প। ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১০ জেলায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল দেশীয় মাছের প্রজনন রক্ষা এবং গরিব জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, চার বছরে দেশীয় মাছের উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়েও বেড়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. খালিদুজ্জামান জানান, ২০২১ সালে প্রকল্প এলাকার দেশীয় মাছের উৎপাদন ছিল প্রায় ৪ লাখ টন। ১৬ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হলেও ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ৫০ হাজার টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন হয়েছে।
তিনি বলেন,“প্রকল্পের মাধ্যমে ১৬ হাজার ৬৫০টি জেলে পরিবারকে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। কেউ পেয়েছেন দুটি করে ছাগল, কেউ বকনা বাছুর, আবার কেউ পেয়েছেন ভ্যান। ফলে প্রজনন মৌসুমে তারা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন।” প্রকল্পের আওতায় ৮ হাজার ৪০৫ পরিবারকে দুটি করে ছাগল, ৭ হাজার ৯৪৫ পরিবারকে একটি করে বকনা বাছুর এবং ৩০০ পরিবারকে একটি করে ভ্যান দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৩০ হাজার মৎস্যজীবীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে নিরাপদ ও আধুনিক মৎস্যচাষে। এছাড়া ২০০টি অভয়াশ্রম স্থাপন এবং অবৈধ জাল ধ্বংসের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের জেলে রব হাওলাদারের স্ত্রী জরিনা বেগম বলেন, “মাছের ডিম ছাড়ার সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখতে মৎস্য অফিস থেকে দুই বছর আগে দুইটা ছাগল দেওয়া হয়। এখন সেই দুইটা ছাগল থেকে ১৩টা ছাগল হয়েছে। দুইটা বিক্রি করে ১২ হাজার টাকা পেয়েছি। সামনে কোরবানিতে আরও দুইটা বিক্রি করব।”
তিনি বলেন, “আগে শুধু মাছ ধরার আয়ের ওপর নির্ভর ছিলাম। এখন ছাগল বিক্রি করেও সংসারে বাড়তি আয় হচ্ছে। তাই মাছের ডিম দেওয়ার সময় স্বামী মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে।” একই উপজেলার পশ্চিম ধারাবাশাইল গ্রামের সঞ্জয় অধিকারী বলেন, “মৎস্য অফিস থেকে তিন বছর আগে একটি ভ্যান দেওয়া হয়। এখন আমি ভ্যান চালিয়ে ছয়জনের সংসার চালাই। তাই মার্চ থেকে মে পর্যন্ত মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। এতে এলাকায় কৈ, শিং, মাগুর, পুঁটি, ট্যাংরাসহ দেশি মাছ অনেক বেড়েছে।”
মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তারা এখন সচেতনভাবে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখছেন। পাশাপাশি অবৈধ জাল উদ্ধারে অভিযানও চলছে। এতে প্রতি বছর জেলায় প্রায় দুই হাজার টন দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়ছে।”
প্রকল্পের সুফলভোগীরা চান, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ না রেখে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হোক। তাদের বিশ্বাস, তাহলে একদিকে যেমন বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে দেশীয় মাছ, অন্যদিকে হাজারো দরিদ্র জেলে পরিবারের জীবনেও আসবে স্থায়ী পরিবর্তন।