উপস্থিত শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সালাম।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় আমাকে আমন্ত্রণ দেওয়ার জন্য এফবিসিসিআই স্ট্যান্ডিং কমিটি অন রিহ্যাবিলিটেশন অব সিক ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মহোদয় কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
“ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প পুনর্বাসন ও সরকারি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে করণীয় নির্ধারণ” বিষয়টি বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা সবাই জানি, গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি,বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানামুখী নীতিগত চ্যালেঞ্জের কারণে দেশের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, আবার অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
এই বাস্তবতায় সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প পুনরায় সচল করার নির্দেশনা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও প্রশংসনীয়। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর, সময়োপযোগী এবং সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান।
আমি মনে করি, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকে শুধুমাত্র ঋণখেলাপি হিসেবে দেখলে হবে না; বরং জাতীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু একজন উদ্যোক্তার ক্ষতি নয়—বরং হাজারো শ্রমিকের জীবিকা, সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি।
এই প্রেক্ষাপটে আমি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরতে চাই— প্রস্তাবনা ও করণীয়
১. বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন-
ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প পুনর্বাসনের জন্য স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধাসহ একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ‘সিঙ্গেল ডিজিট’ সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
২. ঋণ পুনঃতফসিল ও সিআইবি সুবিধা-
অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য বাস্তবসম্মত ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং সাময়িকভাবে সিআইবি (CIB) জটিলতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা নতুনভাবে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পান।
৩.এক্সিট পলিসি প্রণয়ন-
যেসব উদ্যোক্তা আর ব্যবসায় ফিরতে সক্ষম নন, তাদের জন্য একটি সম্মানজনক ও বাস্তবসম্মত “এক্সিট পলিসি” প্রণয়ন জরুরি। এতে দীর্ঘদিনের আর্থিক ও আইনি জটিলতা হ্রাস পাবে।
৪.গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহায়তা-
উৎপাদন সচল রাখতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্প সচল না থাকলে পুনর্বাসন কার্যকর হবে না।
৫.এফবিসিসিআই-তে ডেডিকেটেড সেল গঠন-
এফবিসিসিআই-তে একটি বিশেষ “রুগ্ন শিল্প সহায়তা ডেস্ক” বা সেল গঠন করা যেতে পারে, যা সরাসরি শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবে।
৬.বাজেট ও নীতি সহায়তা-
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রুগ্ন শিল্পের জন্য বিশেষ কর ছাড়, ট্যাক্স হলিডে, সহজ শর্তে ঋণ এবং অন্যান্য নীতি সহায়তার জোরালো দাবি জানাতে হবে।
৭.সবুজ ও টেকসই শিল্পায়ন/
ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে হবে। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে “গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি” হবে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি। প্রস্তাবিত তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ
১. দেশের সকল জেলা থেকে রুগ্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত করা।
২. সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি “হাই-লেভেল টাস্কফোর্স” গঠন করা।
৩. পুনর্বাসনযোগ্য শিল্পগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা প্রদান করা।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সরকার, ব্যাংক, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা এই সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো। শিল্পকে বাঁচাতে পারলে কর্মসংস্থান বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে।
পরিশেষে, এফবিসিসিআই স্ট্যান্ডিং কমিটি অন রিহ্যাবিলিটেশন অব সিক ইন্ডাস্ট্রিজকে এ ধরনের সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আশা করি আজকের সভার সুপারিশসমূহ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথ গুরুত্ব পাবে।