• ১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৭শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যেভাবে বাঙালি হিন্দুদের প্রধান উৎসব হলো দুর্গাপূজা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১২, ২০২৬, ০১:৫১ পূর্বাহ্ণ
যেভাবে বাঙালি হিন্দুদের প্রধান উৎসব হলো দুর্গাপূজা
সংবাদটি শেয়ার করুন....

কয়েক শতাব্দীর বিবর্তন, জমিদারদের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, সর্বজনীন পূজার প্রসার ও বাঙালির সাংস্কৃতিক আবেগের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা পরিণত হয়েছে বাঙালি হিন্দুদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবে।

এ বছর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। তবে এই উৎসব রাতারাতি প্রধান ধর্মীয় আয়োজনে পরিণত হয়নি। কয়েক শতাব্দী ধরে ধর্মীয় আচার, সামাজিক পরিবর্তন, শিল্পকলা ও সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

দুর্গাপূজার ইতিহাস বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন, বিত্তশালী জমিদার পরিবারের উত্থান, সর্বজনীন পূজার বিস্তার এবং দেবী দুর্গাকে ঘিরে বাঙালির স্বতন্ত্র আবেগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। বাঙালির কল্পনায় দুর্গা শুধু অশুভ শক্তির বিনাশকারী দেবী নন, তিনি সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসা আদরের কন্যাও।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা

দুর্গাপূজার ইতিহাসে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর আন্তঃসরকারি কমিটির ১৬তম অধিবেশনে ‘কলকাতার দুর্গাপূজা’ মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

ধর্মীয় আচার, শিল্পকলা, কারুশিল্প, জনসম্পৃক্ততা ও সামাজিক সহযোগিতার সমন্বয়কে এ স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুর্গাপূজা এশিয়ার প্রথম উৎসব হিসেবে এই স্বীকৃতি পায়। এর মধ্য দিয়ে প্রথাগত ধর্মীয় উপাসনার গণ্ডি ছাড়িয়ে দুর্গাপূজার বিস্তৃত সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।

বাংলায় দেবী দুর্গার স্বতন্ত্র ঐতিহ্য

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার পূজা হলেও বাংলার শারদীয় দুর্গাপূজা একটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহিষাসুর নামের মহিষরূপী অসুরকে পরাজিত ও বধ করেন দেবী দুর্গা। এর মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির ওপর দৈবশক্তির বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলায় দেবী দুর্গা উমা নামেও পরিচিত। তিনি হিমালয় ও মেনকার আদরের কন্যা, যিনি প্রতিবছর কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। প্রচলিত বাঙালি প্রতিমায় তাঁর সঙ্গে থাকেন সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ।

পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে মাতৃত্ব, পারিবারিক পুনর্মিলন ও ঘরে ফেরার আবেগের এই সমন্বয় দুর্গাপূজাকে কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং এর সঙ্গে বাঙালির গভীর আবেগ ও আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

দুর্গাপূজার জাঁকজমক বাড়ান জমিদাররা

ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলার বিত্তশালী জমিদার ও রাজপরিবারগুলো জাঁকজমকপূর্ণ শারদীয় দুর্গাপূজা আয়োজনের ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন বাংলার শারদীয় দুর্গাপূজার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের ইতিহাসে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।

সুবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপূজার ঐতিহ্য ১৬১০ সাল থেকে চলে আসছে বলে কথিত রয়েছে। অন্যদিকে, কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বিখ্যাত দুর্গাপূজা শুরু হয় ১৭৫৭ সালে।

অভিজাত পরিবারগুলোর কাছে এসব আয়োজন ছিল ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি বিত্ত, মর্যাদা ও সামাজিক প্রভাব প্রদর্শনের উপলক্ষ। সংগীত, ভোজ, নাট্য পরিবেশনা এবং বর্ণাঢ্য সাজসজ্জার মধ্য দিয়ে পূজা বড় ধরনের সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। ফলে দুর্গাপূজা ক্রমে বাঙালির বৃহত্তর সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

জমিদারবাড়ি থেকে গণমানুষের উৎসব

দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার আয়োজন করত বিত্তশালী জমিদার পরিবারগুলো। সাধারণ মানুষ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিলেও অভিজাতদের ব্যক্তিগত আয়োজনে সবার প্রবেশাধিকার ছিল না।

সময়ের সঙ্গে বারোয়ারি পূজার প্রসারের মধ্য দিয়ে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়। এ ধরনের পূজায় একাধিক ব্যক্তি বা পরিবার চাঁদা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে আয়োজন করতেন।

প্রচলিত একটি বিবরণ অনুযায়ী, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় কয়েকজন বন্ধু একত্র হয়ে পূজার আয়োজনের মাধ্যমে এই ধারার সূচনা করেন। তবে ঐতিহাসিক বিবরণে এর সময়কাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, এ আয়োজন ১৭৬০-এর দশকে, আবার কারও মতে, ১৭৯০ সালের দিকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কলকাতায় সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে আয়োজিত পূজা ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘সার্বজনীন’ শব্দটি সবার জন্য উন্মুক্ত উৎসবের ধারণাকে ধারণ করে। এর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা কোনো একটি পরিবারের আয়োজনের পরিবর্তে পুরো সম্প্রদায়ের উৎসবে পরিণত হতে থাকে।

এ পরিবর্তনের ফলে পূজায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ে। মানুষ চাঁদা দেওয়া, স্বেচ্ছাসেবা এবং আয়োজনের বিভিন্ন কাজে যুক্ত হতে শুরু করেন। একই এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সম্মিলিতভাবে উৎসব উদযাপনের সুযোগ পান।

পাশাপাশি রাস্তা, উঠান ও পরবর্তী সময়ে সুসজ্জিত পূজামণ্ডপ উপাসনার পাশাপাশি সামাজিক মিলনমেলার পরিসরে পরিণত হয়। এভাবেই দুর্গাপূজা একটি পরিবারের একক আয়োজন থেকে বেরিয়ে এসে গণমানুষের উৎসবে রূপ নেয়।

বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক

ভাষা, সাহিত্য, খাবার, সংগীত, পারিবারিক সম্পর্ক ও অভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি পরিচয় প্রকাশ পায়। দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে এসব উপাদানকে একটি বার্ষিক উৎসবে একত্র করেছে।

মহালয়া, ঢাকের বাদ্যধ্বনি, প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ, আড্ডা, খাবার, নতুন পোশাক এবং বিজয়া দশমী এ উৎসবের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। অনেক বাঙালির কাছে মহিষাসুরমর্দিনী পাঠের মধ্য দিয়ে মহালয়া উৎসবের আবেগঘন সূচনা ঘটায়। ঢাকের শব্দ তৈরি করে পূজার পরিচিত আবহ।

মৃৎশিল্পী ও কারুশিল্পীরা মাটি দিয়ে নির্মাণ করেন দেবী প্রতিমা। নকশাবিদ ও শিল্পীরা পূজার জন্য তৈরি করেন নান্দনিক অস্থায়ী মণ্ডপ। এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হন নানা পেশার মানুষ।

বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, একসঙ্গে খাবার খাওয়া ও নতুন পোশাক পরার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা দৈনন্দিন সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। বিজয়া দশমীতে দেবীর বিদায়ের মুহূর্তে জাগে মিলন ও বিচ্ছেদের আবেগ।

ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার জনজীবন, সাহিত্য, শিল্পকলা ও সামষ্টিক পরিচয়বোধে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। সে সময় দুর্গাপূজা আরও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক তাৎপর্য লাভ করে। ধর্মীয় সমাবেশ মানুষের মধ্যে অভিন্ন পরিচয় ও আত্মীয়তার অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। তবে দুর্গাপূজার পুরো ইতিহাসকে শুধু জাতীয়তাবাদের উত্থানের সঙ্গে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বাঙালির ঘরে ফেরা কন্যা দুর্গা

দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে এত ব্যক্তিগত ও আবেগঘন হয়ে ওঠার একটি বড় কারণ দেবীকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক কল্পনা। বাংলায় দুর্গা শুধু মহিষাসুরবধকারী যোদ্ধা নন, তিনি উমা—স্বামীর গৃহ থেকে মা-বাবার কাছে ফিরে আসা আদরের কন্যা।

তাঁর এই আগমন মাত্র কয়েক দিনের জন্য। তাই বিদায়ের সময় বাঙালির মনে জাগে বিষণ্নতা। দেবীর ঘরে ফেরার এই কাহিনির সঙ্গে বাঙালির পারিবারিক জীবন, ঘরে ফেরা, বিচ্ছেদ ও স্নেহের পরিচিত অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে।

ফলে দুর্গাপূজা দুটি আবেগঘন স্তরে কাজ করে। ধর্মীয়ভাবে ভক্তরা দেবীকে মাতৃরূপে পূজা করেন। সাংস্কৃতিকভাবে তাঁরা উদযাপন করেন আদরের কন্যার ঘরে ফেরা এবং পরিবার ও সম্প্রদায়ের পুনর্মিলন।

এই আবেগঘন সংযোগের কারণেই আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচারের বাইরেও বহু বাঙালির কাছে দুর্গাপূজা অর্থবহ হয়ে রয়েছে।

আঞ্চলিক উৎসব থেকে আধুনিক সাংস্কৃতিক আয়োজন

বিংশ শতাব্দীতে সর্বজনীন দুর্গাপূজা শিল্পকলার নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সামাজিক সংগঠন ও জনসম্পৃক্ত উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বর্তমানে এ আয়োজনে যুক্ত হন ভাস্কর, চিত্রশিল্পী, স্থপতি, আলোকসজ্জাবিদ, সংগীতশিল্পী, স্বেচ্ছাসেবক ও দর্শনার্থীরা।

ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যেও দুর্গাপূজার ঐতিহ্য বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশে দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। দেশের নিজস্ব ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে এ উৎসবের স্থানীয় ঐতিহ্যও গড়ে উঠেছে।

কোনো একটি রাজকীয় ঘোষণা, ধর্মীয় সংস্কার কিংবা একক ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়নি। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এর বিকাশ ঘটেছে।

দুর্গাপূজা একই সঙ্গে একটি হিন্দু ধর্মীয় উৎসব এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ বাহক। এটি যেমন পবিত্র উপাসনার উপলক্ষ, তেমনি ঘরে ফেরা, সৃজনশীলতা, সামাজিক বন্ধন ও আত্মপরিচয় উদযাপনের উৎসব। এ কারণেই অসংখ্য বাঙালির কাছে দুর্গার আগমন মানে শুধু দেবীর আগমন নয়, বরং উৎসবের ঋতুরও আগমন।