জমির শ্রেণি পরিবর্তন দেখিয়ে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
ডামুড্যা (শরীয়তপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের আতলা কুড়িগ্রাম এলাকায় একই দাগের জমি পৃথক দলিলে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণি হিসেবে উল্লেখ করার অভিযোগ উঠেছে। একটি দলিলে জমিকে ‘নাল’ এবং অপর একটি দলিলে একই দাগের জমিকে ‘বাগানবাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করায় জমির প্রকৃত শ্রেণি ও দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আতলা কুড়িগ্রাম গ্রামের সরদার বাড়ি জামে মসজিদের নামে ক্রয় করা ১০ শতাংশ জমির মূল্য দলিলে ২ লাখ ২৭ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে এবং জমিটির শ্রেণি ‘নাল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, একই দাগের জমির অপর একটি ক্রয় দলিলে কালু সরদারের জমিকে ‘বাগানবাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—একই দাগের জমির শ্রেণি পৃথক দুই দলিলে ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হলো কেন? জমির শ্রেণি নির্ধারণে কোন সরকারি রেকর্ড, খতিয়ান বা সরেজমিন তথ্য অনুসরণ করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারীদের দাবি, জমির প্রকৃত শ্রেণি যদি ‘নাল’ হয়ে থাকে, তাহলে একই দাগের জমিকে অন্য দলিলে ‘বাগানবাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করার কারণ তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, জমির শ্রেণি ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হলে দলিলের মূল্য, জমির প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
দলিল লেখকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
এ ঘটনায় দলিল লেখক মো. নাজমুল হোসেনের নামও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মো. আবুল হোসেন সরদারের ছেলে মো. নাজমুল হোসেনের নামে ডামুড্যা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখার লাইসেন্স রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্স নম্বর ০৮/২০১২।
অভিযোগকারীদের দাবি, মো. নাজমুল হোসেন ও তার বাবা মো. আবুল হোসেন সরদারকে ঘিরে জমি ও দলিলসংক্রান্ত আরও বিভিন্ন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট দলিল, এসএ ও বিএআরএস রেকর্ড, খতিয়ান, দাগের শ্রেণি এবং জমির বর্তমান সরেজমিন অবস্থা যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে।
তিন খাম্বা এলাকার অভিযোগও সামনে
এদিকে কনেশ্বর ইউনিয়নের তিন খাম্বা এলাকাকে ঘিরেও একই দলিল লেখকের লাইসেন্সের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মরহুম রমিজ উদ্দিন সরদারের স্ত্রীর সম্পত্তি অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের একটি উদ্যোগের সঙ্গে মো. আবুল হোসেন সরদারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে মামলা হলে ওই মামলায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও মামলার কাগজপত্র যাচাই করে সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
লিমার জমির দলিল নিয়েও বিরোধ
অপরদিকে, আতলাকুড়ি গ্রামের জালাল সরদারের স্ত্রী মিসেস লিমার নামে ১০ শতাংশ জমি ক্রয়ের একটি দলিল নিয়েও বিরোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দলিলে ১০৮ নম্বর দাগের জমির শ্রেণি ‘বাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তীতে উক্ত দলিল লেখক এর পিতা মো. আবুল হোসেন সরদারের উদ্যোগে সালিশ বসানো হয় এবং ১০৮ নম্বর দাগের পরিবর্তে অন্য দাগে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সালিশের সময় ‘বাড়ি’ শ্রেণির জমির পরিবর্তে ‘পুকুর’ ও ‘নাল’ শ্রেণির জমি বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত ওই সালিশ বৈঠক সফল হয়নি বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, পরবর্তীতে সালিশটি বাতিল করা হয়। বিষয়টি নিয়ে লিমার পরিবার আদালতের আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানা গেছে।
প্রশাসনিক তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের মূল প্রশ্ন—একই দাগের জমি যদি এক দলিলে ‘নাল’ এবং অন্য দলিলে ‘বাগানবাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে, তাহলে কোন তথ্যের ভিত্তিতে এভাবে জমির শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে?
তারা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দলিল, এসএ/বিএআরএস খতিয়ান, পর্চা, নামজারি ও অন্যান্য সরকারি রেকর্ড যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সরেজমিনে জমি পরিমাপ ও শ্রেণি যাচাই করার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি রেকর্ড ও দলিলে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্যও তদন্তে গ্রহণ করে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে প্রশাসনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে একই দাগের জমির শ্রেণি নিয়ে ওঠা বিভ্রান্তি দূর হওয়ার পাশাপাশি দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।