• ১৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল তুলা উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০১:৪৯ পূর্বাহ্ণ
২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল তুলা উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের
সংবাদটি শেয়ার করুন....

দেশের বস্ত্রশিল্পের কাঁচা তুলার চাহিদা মেটাতে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে ১৯ লাখ বেল আঁশতুলা উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে চাষের জমি সম্প্রসারণ, নতুন এলাকায় তুলা চাষ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দেশের বস্ত্রশিল্পের কাঁচা তুলার চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ লাখ বেল, ২০৪০ সালের মধ্যে ১০ লাখ বেল এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল আঁশতুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য তুলা চাষের জমি বাড়িয়ে দুই লাখ হেক্টরে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে দেশে বছরে ১৬ লাখ বেল তুলার চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পূরণ হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন বাসসকে বলেন, দেশের ৫০টিরও বেশি জেলায় তুলা উৎপাদন বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনার আওতায় মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার ও নীলফামারী জেলায় তুলা চাষ সম্প্রসারণ করা হবে।

বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলা ও ১৩২টি উপজেলায় উফশী ও পাহাড়ি জাতের তুলা চাষ হচ্ছে। মোট তুলা চাষের জমির ৬৯ শতাংশে উফশী এবং ৩১ শতাংশে পাহাড়ি তুলা উৎপাদিত হয়। প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার বেল আঁশতুলা উৎপাদন করা হচ্ছে।

তুলা চাষ সম্প্রসারণের জন্য উঁচু চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল, উপযোগী পাহাড়ি জমি, কম উর্বর ও কম উৎপাদনশীল জমি, লবণাক্ততা ও খরাপ্রবণ এলাকা এবং সরকারি খাসজমি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ফলের বাগান, সবজি, ডাল ও মসলার সঙ্গে আন্তঃফসল হিসেবে তুলা চাষের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতবিনিময় সভায় দেশের তুলা উৎপাদনের সম্ভাবনাগুলো পর্যালোচনা করে বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় সিডিবিকে। এ ছাড়া গত ১৬ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম সভায় স্থানীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয় কমাতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

স্বাধীনতার পর তুলা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পরপরই দেশে সিডিবি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে তুলা চাষ শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে রংপুর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উফশী জাতের ‘ডেল্টাপাইন-১৬’ তুলার চাষ সম্প্রসারণ করা হয়।

১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলাবীজ আমদানির পর তুলা গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুরে ‘কটন রিসার্চ সেন্টার অ্যান্ড সিড প্রোডাকশন ফার্ম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিডিবির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খামারের নাম পরিবর্তন করে ‘কটন রিসার্চ, ট্রেনিং অ্যান্ড সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফার্ম’ রাখেন। ১৯৯৪ সালে তিনি গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি তুলা খামার উদ্বোধন করেন।

বর্তমানে আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি সংযোজন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এসব খামারকে আধুনিক তুলা গবেষণা ও বীজ উৎপাদন ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে সরকার।

তুলা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পাশাপাশি তুলাচাষিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে তুলা আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

জনবল সংকটে উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ

তুলা উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সিডিবির মাঠপর্যায়ে জনবলসংকটকে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ৮৬৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ৪৮৩টিতে জনবল কর্মরত রয়েছেন। বাকি ৩৮১টি পদ শূন্য রয়েছে।

সিডিবির মৃত্তিকা পুষ্টি ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজা বলেন, পাট চাষের বিস্তার কমে যাওয়ার পর তুলা দেশের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘দেশে তুলার মতো এতটা লাভজনক অন্য কোনো ফসল নেই। তাই তুলা উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করা হলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং কাঁচা তুলা আমদানির পরিমাণও কমবে।’

সিডিবির বিশেষজ্ঞদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে তুলা চাষে আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে ওই জমিতে ১৫ মণ (৩৭.৩২ কেজি) কাঁচা তুলা উৎপাদন করে একজন কৃষক প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, দেশে প্রতি কেজি তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানি ব্যয়ের চার মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি তুলার বীজ বপন শুরু হয় এবং ডিসেম্বর মাসে ফসল সংগ্রহ করা হয়।

মাটির উর্বরতা রক্ষায় তুলা চাষের ভূমিকা

তুলা চাষের পরিবেশগত উপকারিতা তুলে ধরে সিডিবির জ্যেষ্ঠ জিনিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন বলেন, তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও উর্বরতা বাড়াতে সহায়ক। অন্যদিকে, একই জমিতে পরপর তিনবার ভুট্টা চাষ করলে মাটির উর্বরতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।

তবে তুলার চাহিদা ও স্থানীয় উৎপাদন নিয়ে প্রতিবেদনে ভিন্ন হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের বস্ত্রশিল্পে বছরে আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল তুলার প্রয়োজন হয়। এ বিপুল চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদনে ব্যবসায়িক চাহিদার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ পূরণ হচ্ছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৭৩ লাখ বেল কাঁচা তুলা ও সুতা আমদানিতে ৮০ হাজার কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে।