• ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তৃণমূলের শিল্পায়নে নতুন গতি আনতে বিসিকের মহাপরিকল্পনা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ১৬:০৬ অপরাহ্ণ
তৃণমূলের শিল্পায়নে নতুন গতি আনতে বিসিকের মহাপরিকল্পনা
সংবাদটি শেয়ার করুন....

দেশের শিল্পায়নকে রাজধানীকেন্দ্রিকতার বাইরে ছড়িয়ে দিতে ৮৪টি শিল্পনগরী ও পার্কের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, বন্ধ ও রুগ্ন কারখানা পুনরায় চালু, অব্যবহৃত শিল্পপ্লট বরাদ্দ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।

তৃণমূল পর্যায়ে শিল্পায়নের গতি বাড়াতে দেশের ৮৪টি শিল্পনগরী ও পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার, বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু এবং অব্যবহৃত শিল্পপ্লট দ্রুত বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রায় সাত দশক আগে দেশের শিল্পায়নকে রাজধানীকেন্দ্রিকতার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিসিকের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন এলেও পুরোনো অনেক শিল্পনগরীর অবকাঠামো সেই অনুযায়ী আধুনিক করা সম্ভব হয়নি। নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিসিকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন শিল্পনগরী সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন। বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বিসিকের বর্তমান পরিস্থিতি, চলমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

বেনজীর আহমেদ বলেন, দেশের অনেক শিল্পনগরী কয়েক দশক আগে নির্মিত হয়েছে। ওই সময়ের শিল্প ও পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

তিনি জানান, ষাটের দশকে শিল্পনগরীগুলো নির্মাণের সময় ভারী ট্রাক ও লরির চলাচল সীমিত ছিল। সে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ সড়ক তৈরি করা হলেও বর্তমানে শিল্পকারখানায় কাঁচামাল আনা এবং উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে নিয়মিত ভারী যানবাহন চলাচল করছে। এতে পুরোনো সড়কগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিল্পনগরীগুলোর অনেক জায়গায় ড্রেনেজ, আলোকসজ্জা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিসিক চেয়ারম্যান।

নতুন পরিকল্পনায় শিল্পনগরীর নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুরোনো অনেক শিল্পনগরীতে পর্যাপ্ত সীমানাপ্রাচীর নেই। কোথাও নিরাপত্তা গেট নষ্ট হয়ে গেছে, আবার কোথাও পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা বা সিসিটিভি ব্যবস্থা নেই।

বেনজীর আহমেদ বলেন, উদ্যোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও উন্নত শিল্পপরিবেশ নিশ্চিত করতে বিসিকের প্রকৌশল বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো চিহ্নিত করা হচ্ছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পনগরীগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনাও বিসিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বর্তমানে বিসিকের আওতায় ৬ হাজার ২২৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে পড়েছে এবং কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

বিসিক চেয়ারম্যান জানান, কোন কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে এবং সেগুলো পুনরায় চালু করতে উদ্যোক্তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ জন্য প্রতিটি শিল্পনগরীর প্রধানকে বন্ধ ও রুগ্ন কারখানাগুলোর বিস্তারিত তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণ, বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে অগ্রগতিও হয়েছে। গত ছয় মাসে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৪৩টি বন্ধ মিল ও কারখানাকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

বেনজীর আহমেদ বলেন, শুধু বন্ধ কারখানা চালু করাই লক্ষ্য নয়। সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ভবিষ্যতে সংকটে পড়ে বন্ধ না হয়, সে জন্য আগেই সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।

নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিসিক। পুরোনো ও নতুন শিল্পপার্কে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত বা বরাদ্দবিহীন থাকা প্লটগুলো দ্রুত নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬০০টির বেশি শিল্পপ্লট বরাদ্দের জন্য নতুন করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। দ্রুত বরাদ্দ প্রক্রিয়া শেষ করে এসব প্লটে শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি করতে চায় বিসিক।

বিসিক চেয়ারম্যানের মতে, অব্যবহৃত প্লটে নতুন শিল্প স্থাপন হলে বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।

দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের অন্যতম বড় ভিত্তি বিসিকের আওতাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিসিক। দক্ষ উদ্যোক্তা ও কর্মী তৈরি হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও আরও সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেনজীর আহমেদ বলেন, বিসিককে শুধু শিল্পপ্লট বরাদ্দকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তিনি। তৃণমূলের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিককে গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিল্পনগরীর সড়ক, ড্রেনেজ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো আধুনিক করার পাশাপাশি বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিসিক চেয়ারম্যান মনে করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পায়নের যে ভিত্তি বিসিক ইতোমধ্যে তৈরি করেছে, সেটিকে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত অবকাঠামো এবং নতুন বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তৃণমূলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তিনি বলেন, শিল্পনগরীগুলো নিরাপদ, আধুনিক ও উদ্যোক্তাবান্ধব হয়ে উঠলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। বন্ধ কারখানা চালু হলে উৎপাদন বাড়বে, নতুন শিল্প স্থাপিত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহও বাড়বে।

ঢাকার বাইরে শিল্পায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক শিল্প ও রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের শিল্পায়নের ভিত্তি গড়ে তোলা বিসিকের সামনে এখন শুধু পুরোনো অবকাঠামো সংস্কারের কাজ নয়; পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুরো শিল্প সহায়তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগও রয়েছে।

পরিকল্পিত আধুনিকায়ন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুনরুজ্জীবন এবং নতুন বিনিয়োগের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তৃণমূলের শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে উঠবে বলে আশা করছেন বিসিক চেয়ারম্যান।

আরো পড়ুন

দৈনিক ভোর
×
Loading...