• ১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৭শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ, ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে মিলবে প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্র

উদ্যোক্তাদের ৬০ শতাংশ নারী, ৪০ শতাংশ পুরুষ; ৬৪ জেলার ২০৮ উপজেলায় চলছে প্রশিক্ষণ ও ব্যবসা উন্নয়নের কার্যক্রম

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ
দেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ, ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে মিলবে প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্র
সংবাদটি শেয়ার করুন....

কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি বাড়াতে সারা দেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচিতে ৬০ শতাংশ নারী ও ৪০ শতাংশ পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ, বাজারসংযোগ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি কেনায় ভর্তুকি দেওয়ার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগকে লাভজনক করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ (পার্টনার) প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। দেশের ৬৪ জেলার ২০৮টি উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ, নার্সারি, মাশরুম, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত পণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে উদ্যোক্তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।

প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে ম্যাচিং গ্র্যান্ট বা সমপরিমাণ অংশীদারত্বভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় গৃহপর্যায়ে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি কেনায় প্রকল্প থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হবে। বাকি ৩০ শতাংশ ব্যয় বহন করতে হবে উদ্যোক্তাকে।

এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের অন-দ্য-জব প্রশিক্ষণ, ব্যবসা পরিচালনায় পরামর্শ এবং ইনকিউবেশন সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে পণ্যের মান উন্নয়ন, উৎপাদন ও সংরক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পার্টনার-ডিএএম অঙ্গের এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় সাত হাজার উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, মাশরুম, নার্সারি, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক খাতে উদ্যোক্তা তৈরির কাজ চলছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা জ্ঞান এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সময়ে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন বাধা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে ইনকিউবেশন সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও রপ্তানি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যকে কেন্দ্র করে ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পণ্যগুলো হলো—আলু, আম, কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চাল।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব পণ্যের উৎপাদক, ব্যবসায়ী, প্রক্রিয়াজাতকারী ও বাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে। এতে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো সহজ হবে। ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডির নীতিমালা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদিত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় ইতোমধ্যে ৭৬৭টি মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল গঠন করা হয়েছে।

পার্টনার প্রকল্পের এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক জানান, যে এলাকায় যে পণ্যের উৎপাদন বেশি, সেখানে সেই পণ্যকে কেন্দ্র করে এসব স্কুল গড়ে তোলা হচ্ছে। আলুর জন্য ২২৭টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। চলতি বছর আরও ৩৩৫টি স্কুল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব স্কুলে কৃষক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, হিমাগার মালিক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যান্য বাজার-অংশীজনকে একত্র করা হচ্ছে। এর ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সমস্যা এবং সম্ভাবনা চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পার্টনার প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বাসসকে বলেন, উদ্যোক্তারা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হন না, তাঁরা অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেন। নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিক ও সম্মানজনক পেশায় পরিণত করা সম্ভব। প্রশিক্ষিত তরুণদের উদ্যোগ কৃষির উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে সহায়তা করবে।

কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির এ কর্মসূচির একটি উদাহরণ গাজীপুরের তামিমা আক্তার ন্যান্সি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ১২ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক দক্ষতা অর্জন করেন।

গাজীপুরের সদর থানার পিরুজালী ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের ন্যান্সি পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের উদ্যোগে কিছু করার পরিকল্পনা করেন। সেই ভাবনা থেকে শুরু করেন জ্যাম, জেলি, আচার, কাঁঠাল ও মাছের চিপস তৈরি এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রি।

শুরুর দিকে পণ্য নির্বাচন, উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হলেও প্রশিক্ষণ তাঁর উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। গাজীপুর কৃষি বিপণন কর্মকর্তার সহযোগিতায় তিনি ট্রেড লাইসেন্স, স্বাস্থ্য সনদসহ প্রয়োজনীয় লাইসেন্স সংগ্রহ করেন।

ন্যান্সির প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যান্সি অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুড’-এ বর্তমানে চারজন কাজ করছেন। তাঁর এ উদ্যোগ দেখায়, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেলে তরুণেরা কৃষিপণ্যকে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করে ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন।

কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের কৃষিতে উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সম্প্রসারণে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়তে পারে।

বিশেষ করে আলু, আম, কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চালের মতো পণ্যে মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে এ উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, ভর্তুকি পাওয়ার স্বচ্ছতা, যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারসংযোগ এবং রপ্তানির উপযোগী সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর।

সরকারের ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ তাই শুধু প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; এটি কৃষিকে উদ্যোক্তানির্ভর, মূল্য সংযোজনমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে রূপান্তরের একটি প্রচেষ্টা। পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।