• ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ, বড় বাধা জমির সংকট

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ১৬:১৪ অপরাহ্ণ
সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ, বড় বাধা জমির সংকট
সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জমির সংস্থানই এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির সংস্থান করা না গেলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন পিছিয়ে যেতে পারে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এতদিন বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিল। সরকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ শুধু গ্রাহক থাকবে না, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদকেও পরিণত হবে।

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বাংলাদেশ কত দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে পারবে, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।

সম্প্রতি সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এই চাহিদা বিবেচনায় আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানি বিদ্যুৎ, ভাসমান সৌর ও এগ্রিভোলটাইকসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

রুফটপ থেকে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কিনবে সরকার

টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমান বাজারদর এবং বিদ্যুৎ বিভাগ পাওয়া বিভিন্ন দরপত্রের মূল্য বিবেচনায় ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ প্রণোদনার অংশ হিসেবে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কোনও গ্রাহক নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারলে সাশ্রয়কৃত অর্থ তার লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুযায়ী, যেসব গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তারা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাবেন।

তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর পর স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না।

সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্প

৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প রামপালে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের ব্লক ‘বি’তে ৬৮৫ একর জমিতে প্রকল্পটি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে পিডিবি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা এবং পিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অ্যাশ পন্ডের জায়গায় ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

বর্তমানে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং পরামর্শক নিয়োগের কাজ শেষ হয়েছে। এতে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। তবে প্রকল্পটি কবে উৎপাদনে যাবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

সংসদে সৌরবিদ্যুৎ

জাতীয় সংসদের সব কার্যক্রমে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ না নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনাও করছে সরকার।

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে জাতীয় সংসদের সব কার্যক্রমে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে কোনও বিদ্যুৎ গ্রহণ না করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চায় সরকার।

নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের ফলে একদিকে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছে সরকার।

এ লক্ষ্যে নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তরুণ ও যুব সমাজের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

তার মতে, এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ খাতে এগিয়ে আসার সুযোগ পাবেন।

বড় বাধা জমি

বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বিনিয়োগকারীদের নিজেদের জমি কিনে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করতে হলে প্রকল্পের বিনিয়োগ ব্যয় ও উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম—দুটিই বাড়বে। তাই বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি পদ্ধতিতে জমি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর তাদের পতিত জমির তালিকা জমা দিয়েছে। সব মন্ত্রণালয় মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার একর জমির প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রায় ৩০০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকার জমি দেবে এবং বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন। জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

এক মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সাধারণত আড়াই থেকে তিন একর জমি প্রয়োজন হয়।

তবে জমির সংকটকে সৌরবিদ্যুতের প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন না বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, জমির সংকটের কারণে নয়, ভালো ধারণা ও নীতিগত সমস্যার কারণে জ্বালানি রূপান্তর পিছিয়ে যাচ্ছে। জমির পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে সরকারের আন্তরিকতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, দেশের এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সৌরবিদ্যুতের প্রসার চান না। কারণ ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ চালু হলে তা তাদের জন্য লাভজনক হবে না। আগের সরকারগুলো সৌরবিদ্যুতের প্রসারে নানা উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে কাজ এগোয়নি। বর্তমান সরকার নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে।

তার মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

আরো পড়ুন

দৈনিক ভোর
×
Loading...