• ২২শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্লাস্টিকের দাপটে সংকটে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ণ
প্লাস্টিকের দাপটে সংকটে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প
সংবাদটি শেয়ার করুন....

কুমারের চাকার ঘূর্ণনে কাদা-মাটি থেকে তৈরি হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র, খেলনা ও শৌখিন সামগ্রী। বাংলার প্রাচীন এই লোকশিল্প একসময় গ্রামীণ জীবন ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। তবে প্লাস্টিক, মেলামাইন ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের বিস্তার, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং ন্যায্য দাম না পাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন নানা সংকটের মুখে।

কাঠের চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে দক্ষ হাতে কাদা-মাটিকে নানা আকৃতিতে রূপ দেন মৃৎশিল্পীরা। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় কলসি, হাঁড়ি, পাতিল, সানকি, পুতুলসহ নানা ধরনের ব্যবহারিক ও শৌখিন সামগ্রী। রোদে শুকিয়ে চুল্লিতে পোড়ানোর পর এসব পণ্য পায় স্থায়ী রূপ। বাংলার গ্রামীণ জনপদে শত শত বছর ধরে এভাবেই টিকে আছে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য।

মৃৎশিল্প শুধু জীবিকা নির্বাহের একটি মাধ্যম নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক তৈজসপত্রের ব্যাপক ব্যবহারের আগে মাটির তৈরি পাত্র ছিল গ্রামীণ পরিবারের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। সময়ের পরিবর্তনে এর ব্যবহার কমলেও ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এখনো রয়েছে।

মৃৎশিল্পের শিকড় ও নির্মাণপ্রক্রিয়া

‘মৃৎ’ শব্দের অর্থ মাটি আর ‘শিল্প’ অর্থ সুনিপুণ সৃষ্টি। মাটি দিয়ে প্রয়োজনীয় ও নান্দনিক সামগ্রী তৈরির এ শিল্প বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কুমার বা পাল সম্প্রদায়ের কারিগরেরা বংশপরম্পরায় এ শিল্পের চর্চা করে আসছেন।

সিন্ধু সভ্যতা এবং বাংলাদেশের ময়নামতি, মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পোড়ামাটির ব্যবহার এ অঞ্চলে মাটিনির্ভর শিল্পচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসের পরিচয় বহন করে।

মৃৎশিল্প তৈরির কাজ শুরু হয় উপযুক্ত মাটি সংগ্রহের মাধ্যমে। সাধারণত এঁটেল ও দোআঁশ মাটি বাছাই করে তা ভালোভাবে মথে নরম ও মসৃণ করা হয়। এরপর কুমারের চাকার ওপর মাটির তাল রেখে হাতের সাহায্যে প্রয়োজনীয় আকৃতি দেওয়া হয়।

চাকা থেকে নামানোর পর পাত্রগুলো কিছুটা শুকিয়ে কাঠের পিটনা দিয়ে পিটিয়ে আকৃতি ও গঠন ঠিক করা হয়। পরে রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে বিশেষ চুল্লি বা ‘পোনে’ খড়, কাঠ ও ঘুঁটে দিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় পাত্রগুলো শক্ত ও ব্যবহার উপযোগী হয়ে ওঠে।

গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে লোকজ খেলনা

একসময় বাঙালির দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসব ও আয়োজনে মাটির তৈরি পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত সানকি, হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, চাড়িপাতিল, দইয়ের ভাঁড় ও পিঠার ছাঁচ ছিল উল্লেখযোগ্য।

বৈশাখী মেলা ও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে মাটির পুতুল, ব্যাংক, ঘোড়া, হাতি এবং নানা ধরনের রঙিন খেলনা শিশুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠত। পাশাপাশি মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির ফলকচিত্র, পূজার প্রতিমা ও প্রদীপ তৈরিতেও মৃৎশিল্পের ব্যবহার রয়েছে।

এ শিল্পের সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। মাটির সামগ্রী তৈরির বিভিন্ন কাজে পরিবারের সদস্যরা যুক্ত থাকেন। বিশেষ করে পুতুল তৈরি ও রঙের কাজে নারীদের অংশগ্রহণ গ্রামীণ কুটিরশিল্পে তাঁদের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি করেছে।

প্লাস্টিকের পণ্যে সংকুচিত বাজার

আধুনিক সময়ে প্লাস্টিক, মেলামাইন ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি পণ্যের সহজলভ্যতা মৃৎশিল্পের বাজারে বড় পরিবর্তন এনেছে। তুলনামূলক হালকা, সহজে বহনযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে কম দামের এসব পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈজসপত্র পিছিয়ে পড়ছে।

একই সঙ্গে কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ কমে যাওয়া, মাটির দাম বৃদ্ধি এবং পাত্র পোড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। এসব কারণে প্রত্যাশিত লাভ না পাওয়ায় অনেক কারিগরকে পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবতে হচ্ছে।

সাভারের ধামরাই, কুমিল্লার বিজয়পুর ও নাটোরের ঐতিহ্যবাহী পালপাড়ার মতো মৃৎশিল্পের পরিচিত এলাকাগুলোতেও নতুন প্রজন্মের মধ্যে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হওয়ার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে।

আধুনিক নকশায় নতুন সম্ভাবনা

সংকটের মধ্যেও মৃৎশিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ঘর সাজানো ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি আগ্রহ থেকে মাটির তৈরি মগ, খাবারের পাত্র, নকশা করা ফুলদানি, দেয়ালসজ্জার সামগ্রী ও বাতির আবরণের মতো পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী নির্মাণকৌশলের সঙ্গে আধুনিক নকশা ও ব্যবহার উপযোগী বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা গেলে এ শিল্পের পণ্যে নতুন ক্রেতা আকৃষ্ট হতে পারেন। তবে এ জন্য পণ্যের মান, নকশা, বাজারজাতকরণ এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশিক্ষণ, ঋণ ও বাজার সম্প্রসারণের প্রয়োজন

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা মৃৎশিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তি ও নকশাবিষয়ক প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা গেলে উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

একই সঙ্গে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পণ্যের মান বজায় রাখা, উপযুক্ত নকশা তৈরি এবং কার্যকর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মৃৎশিল্পের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে এ শিল্পের পণ্য ও ব্যবহার বদলালেও এর ঐতিহ্যগত গুরুত্ব রয়ে গেছে। কারিগরদের জীবিকা সুরক্ষা, পণ্যের ন্যায্য মূল্য এবং নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাচীন এই লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ রয়েছে।