• ২২শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটনকেন্দ্রে ভিড়, চাঙা স্থানীয় অর্থনীতি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০৪:১৪ পূর্বাহ্ণ
দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটনকেন্দ্রে ভিড়, চাঙা স্থানীয় অর্থনীতি
সংবাদটি শেয়ার করুন....

শারদীয় দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, খাগড়াছড়ি, সাজেক ও রাঙামাটিসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে বেড়েছে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড়। পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যস্ততা বাড়ার পাশাপাশি চাঙা হয়ে উঠেছে পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি।

শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে সমুদ্র, পাহাড় ও হ্রদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে যাচ্ছেন বিভিন্ন গন্তব্যে। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে অবকাশ কাটানোর পাশাপাশি সমুদ্রস্নান, নৌভ্রমণ, পাহাড়ি পথে ঘোরাঘুরি এবং স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁরা।

পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে দেশের জনপ্রিয় ভ্রমণকেন্দ্রগুলো। একই সঙ্গে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও বিনোদনসেবার চাহিদা বাড়ায় পর্যটননির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বেড়েছে কর্মব্যস্ততা।

দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারে দুর্গাপূজার ছুটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা ও নীল সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই সেখানে ভিড় করছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কেউ সমুদ্রস্নানে, কেউ ছবি তোলায়, আবার কেউ সৈকতে বসে সময় কাটাচ্ছেন।

পর্যটকদের আগমনে শহরের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে ব্যস্ততা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, পূজার ছুটিতে কক্সবাজারে কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনেক হোটেলে আগাম কক্ষ বুকিংয়ের হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বাসসকে বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় রাখা হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাতেও পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা নিতে সেখানে যাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। সৈকতে হাঁটাহাঁটি, সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ, স্থানীয় খাবার খাওয়া এবং বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে সময় কাটিয়ে ছুটি উপভোগ করছেন তাঁরা।

পাহাড় ও হ্রদঘেরা পর্যটনকেন্দ্রেও ভিড়

সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও বেড়েছে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা ও মায়াবিনী লেকসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পর্যটকদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ি পথ, ঝরনা ও সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পাশাপাশি জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইংয়ের মতো বিনোদনমূলক কার্যক্রমেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকে।

মেঘে ঢাকা পাহাড়, আঁকাবাঁকা সড়ক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত সাজেক ভ্যালিও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে। সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজ মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ আবাসনকেন্দ্রে আগাম বুকিং বেড়েছে। পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে স্থানীয় পরিবহন, খাবারের দোকান ও অন্যান্য সেবামূলক ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

পাহাড়, সবুজ অরণ্য ও কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশিতে ঘেরা রাঙামাটিতেও পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। জেলা শহরের অন্যতম আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতুতে সকাল থেকেই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ সেতু থেকে পাহাড় ও হ্রদের দৃশ্য উপভোগ করছেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবি তুলছেন।

অনেকে নৌযান ভাড়া করে কাপ্তাই হ্রদ ঘুরে দেখছেন। হ্রদের জলরাশি পেরিয়ে সুবলং ঝরনার দিকে যাত্রাও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় শহরের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতেও ব্যস্ততা বেড়েছে।

রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, দুর্গাপূজার ছুটিকে ঘিরে তাঁদের আবাসনকেন্দ্রের কক্ষগুলোর চাহিদা বেড়েছে। পর্যটকদের আগমন অব্যাহত থাকায় সামনের দিনগুলোতেও ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

জামালপুর থেকে পরিবার নিয়ে রাঙামাটি বেড়াতে আসা শিক্ষক মো. হানিফ বলেন, পাহাড় ও কাপ্তাই হ্রদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁদের মুগ্ধ করেছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আরও আধুনিকায়ন করা গেলে সারা বছরই সেখানে পর্যটকদের আগমন বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ঝুলন্ত সেতুর টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা মো. ইউসুফ বলেন, পূজার ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কমপ্লেক্সের আবাসনে থাকা অতিথিদের পাশাপাশি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী ঝুলন্ত সেতু দেখতে আসছেন। অনেকে নৌযান ভাড়া করে কাপ্তাই হ্রদেও ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব বাসসকে বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সমন্বয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পর্যটকেরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।

পর্যটকদের ভিড়ে চাঙা স্থানীয় অর্থনীতি

পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহন, নৌযান, পর্যটকবাহী জিপ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজের চাপ বেড়েছে।

পর্যটননির্ভর এসব ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় পরিবার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি জনপদগুলোতে পর্যটন মৌসুমের সঙ্গে অনেক মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থান সরাসরি সম্পর্কিত।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে অভ্যন্তরীণ পর্যটন। সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের নীরবতা, ঝরনার জলধারা কিংবা হ্রদের বুকে নৌভ্রমণ—বৈচিত্র্যময় এসব অভিজ্ঞতায় ছুটির আনন্দ উপভোগ করছেন পর্যটকেরা।

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটি একদিকে ভ্রমণপিপাসুদের অবকাশযাপনের সুযোগ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।