• ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসন্ন বাজেটে কী প্রত্যাশা উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের?

সামনে এলো নীতি বিশ্লেষকদের প্রস্তাবনা

মতামত ডেস্ক
প্রকাশিত মে ১৭, ২০২৬, ১৪:৪৭ অপরাহ্ণ
আসন্ন বাজেটে কী প্রত্যাশা উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের?
সংবাদটি শেয়ার করুন....

আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ হতে যাচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য এই বাজেটকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাকে এবারের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

একজন উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী ও নীতি বিশ্লেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা ও প্রস্তাবনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিকাশ, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক কর কাঠামোর দাবি

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে কর্পোরেট করহার আরও যৌক্তিক করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে স্টার্ট-আপ ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য প্রাথমিক কয়েক বছর কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে সুবিধা চালু কিংবা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এতে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত হবেন এবং কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।

সহজ ঋণ ও স্বল্পসুদে অর্থায়নের ওপর জোর

বর্তমানে উচ্চ সুদের হার ব্যবসা সম্প্রসারণের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তাই ব্যাংক ঋণের সুদের হার স্থিতিশীল রাখা এবং জামানতবিহীন স্টার্ট-আপ ফান্ড ও উদ্ভাবনী তহবিল সহজলভ্য করার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক অর্থায়ন নীতিমালা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

ব্যবসার খরচ কমাতে ডিজিটালাইজেশনের আহ্বান

ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা ও অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে দুর্নীতি কমবে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের দাবি

মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট বাড়ানোর দাবি জোরালো হয়েছে। একইসঙ্গে ভাতার পরিমাণ মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে, যাতে নিম্নআয়ের মানুষ বাস্তব সহায়তা পান।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাড়তি বরাদ্দের প্রত্যাশা

টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জিডিপির তুলনায় এই দুই খাতে বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব

অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের জন্য পৃথক থোক বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব এসেছে। একইসঙ্গে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর তাগিদ

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। তাই করের আওতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল মনিটরিং জোরদারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন কর আরোপের আগে বিদ্যমান কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও সহজ করার ওপর জোর দিয়েছেন নীতি বিশ্লেষকরা।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, কৃষি ও স্থানীয় উৎপাদনে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং বাজার মনিটরিং জোরদারের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করাই বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

উন্নয়ন বাজেটে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন

উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির ব্যয়ে গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু বড় অবকাঠামো প্রকল্প নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এমন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন তারা।

উপসংহার

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বাজেট শুধু রাজস্ব আহরণের দলিল হওয়া উচিত নয়; এটি হতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি কার্যকর রূপরেখা।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না বাড়িয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করাই হবে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সফলতা।

– এম,জি,আর নাসির মজুমদার
উদ্যোক্তা | সমাজকর্মী | নীতি বিশ্লেষক
প্রাক্তন পরিচালক-এফবিসিসিআই

আরো পড়ুন

দৈনিক ভোর
×
Loading...