• ২১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোরবানির পশুর বাজারে স্বচ্ছতা আনতে ‘লাইভ ওয়েট’ পদ্ধতি এখন সময়ের দাবি

মতামত ডেস্ক
প্রকাশিত মে ১১, ২০২৬, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ
কোরবানির পশুর বাজারে স্বচ্ছতা আনতে ‘লাইভ ওয়েট’ পদ্ধতি এখন সময়ের দাবি
সংবাদটি শেয়ার করুন....

এম. জি. আর. নাসির মজুমদার
উদ্যোক্তা | সমাজকর্মী | নীতি বিশ্লেষক

কোরবানির পশু কেনাবেচায় আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘ঠিকা’ বা আন্দাজভিত্তিক দর নির্ধারণের প্রচলন রয়েছে। এই পদ্ধতি একদিকে যেমন ঐতিহ্যের অংশ, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বহু ক্ষেত্রে ভোগান্তি ও প্রতারণারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক সময়ের বাস্তবতায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—কোরবানির পশুর বাজার কি আরও স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া উচিত নয়?

এই প্রেক্ষাপটে ‘লাইভ ওয়েট’ বা জীবন্ত ওজন অনুযায়ী পশু বিক্রির ধারণা দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বহু আগেই এই পদ্ধতি চালু হয়েছে। বাংলাদেশেও বাণিজ্যিক খামার ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার প্রসারের ফলে গত এক দশকে ওজনভিত্তিক পশু বিক্রির প্রতি মানুষের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা-

‘ঠিকা’ পদ্ধতিতে পশুর আকৃতি, গঠন, জাত, বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং দরকষাকষির দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এতে অভিজ্ঞ ক্রেতারা অনেক সময় লাভবান হলেও অধিকাংশ সাধারণ মানুষ প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রেই বিক্রেতারা অতিরঞ্জিত দাম হাঁকিয়ে বাজারে কৃত্রিম মূল্যস্ফীতি তৈরি করেন।

অন্যদিকে ‘লাইভ ওয়েট’ পদ্ধতিতে ডিজিটাল স্কেলের মাধ্যমে পশুর সঠিক ওজন নির্ধারণ করে প্রতি কেজি অনুযায়ী দাম হিসাব করা হয়। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ তৈরি হয়।

লাইভ ওয়েট পদ্ধতির বড় সুবিধা-

* দামের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়
* সাধারণ ও অনভিজ্ঞ ক্রেতারা প্রতারণার শিকার হন না
* বাজারে অযৌক্তিক দরবৃদ্ধি কমে আসে
* খামারিরা প্রকৃত মূল্য পান
* ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পশু বাজার গড়ে ওঠে

বিশেষ করে “স্মার্ট বাংলাদেশ” বাস্তবায়নের যুগে কোরবানির পশুর হাটেও প্রযুক্তির ব্যবহার সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়।

কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে-

লাইভ ওয়েট পদ্ধতি শতভাগ নিখুঁত নয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পশুকে অতিরিক্ত পানি বা খাবার খাইয়ে সাময়িকভাবে ওজন বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। আবার অনেক উন্নত জাতের গরুর ক্ষেত্রে শুধু ওজন নয়, গঠন, মাংসের গুণগত মান ও সৌন্দর্যের কারণেও অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারিত হতে পারে।

এছাড়া বড় হাটগুলোতে প্রতিটি পশুর ওজন নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ডিজিটাল স্কেল, দক্ষ জনবল ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে। অন্যথায় ভিড় ও যানজটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সব হাটে ডিজিটাল স্কেল স্থাপন করা জরুরি-

সরকার বা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে যদি প্রতিটি কোরবানির হাটে বাধ্যতামূলকভাবে ডিজিটাল স্কেল স্থাপন করা হয়, তাহলে পশু বাজারে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে।

এর ফলে—

* ক্রেতা প্রতারণা থেকে রক্ষা পাবেন
* বাজারে দালাল ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমবে
* নির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুযায়ী মূল্য নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে
* খামারি ও ভোক্তা উভয়ের আস্থা বাড়বে

সরকার চাইলে প্রতি কেজি লাইভ ওয়েটের একটি যৌক্তিক ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ মূল্যসীমাও নির্ধারণ করতে পারে, যাতে বাজারে অস্থিরতা কমে আসে।

হাসিল আদায় ব্যবস্থাতেও সংস্কার প্রয়োজন

যদি লাইভ ওয়েট পদ্ধতি চালু হয়, তাহলে হাটের ইজারাদারদের প্রচলিত হাসিল আদায়ের ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়বে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পশুর আনুমানিক দামের ওপর ভিত্তি করে হাসিল আদায় করা হয়, যা অস্বচ্ছতা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করে।

ওজনভিত্তিক বিক্রি চালু হলে—

* ডিজিটাল রসিদের মাধ্যমে হাসিল আদায় করা সম্ভব হবে
* সরকার নির্ধারিত নির্দিষ্ট হারে ফি নেওয়া যাবে
* অতিরিক্ত আদায় ও অনিয়ম কমবে
* পুরো ব্যবস্থাকে একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর আওতায় আনা যাবে

উপসংহার

কোরবানির পশুর বাজার শুধু একটি মৌসুমি বাণিজ্য নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ খামারি এবং সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তাই এই বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে হলেও এখন বাস্তবতার প্রয়োজনে ‘লাইভ ওয়েট’ পদ্ধতির দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া উচিত। সঠিক পরিকল্পনা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং কার্যকর তদারকি থাকলে বাংলাদেশের কোরবানির পশুর হাটও একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের বাজারব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে।

“টেকসই ব্যবসা, স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।”