• ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার পাঠ্যবই

খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আনন্দময় শিখন ও কারিগরি দক্ষতায় গুরুত্ব; এনসিসির অনুমোদনের পর ছাপা হবে প্রায় দেড় কোটি কপি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ২১:২৬ অপরাহ্ণ
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার পাঠ্যবই
সংবাদটি শেয়ার করুন....

মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার বাইরে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন চারটি পাঠ্যবই যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তা এবং হাতে-কলমে কর্মদক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বইগুলো প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

নতুন বই চারটি হলো—চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। বইগুলোর পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় এগুলো চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে চারটি বইয়ের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কপি মুদ্রণের পরিকল্পনা করেছে এনসিটিবি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধনির্ভর করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের চিন্তাভাবনা, গবেষণা ও নির্দেশনার আলোকে নতুন বইগুলো অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সংস্কারে মনোযোগ দিয়েছেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার প্রতিফলন হিসেবেই নতুন বইগুলো পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গত ১৫ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, প্রধানমন্ত্রী চান শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে উঠুক। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরি হোক।

মাহ্দী আমিন জানান, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এনসিটিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ লক্ষ্যে একটি দল গঠন করা হয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতাকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাবিদদের নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা ও পরামর্শ সভা হয়েছে।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক বইগুলো তৈরি করা হয়েছে। গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপনের পর বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পর বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য ছাপাখানায় পাঠানো হবে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, বইগুলো মুদ্রণের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই মুদ্রণ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটি ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। শিশুদের শৈশব থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। এতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়মকানুন সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খেলার মাঠে বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয় বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার, আঘাত প্রতিরোধ, পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশ ছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তাঁর সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার কাহিনির মাধ্যমে খেলাধুলার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর হয়ে না ওঠে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি ১১টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করে তুলতে এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা তুলে ধরা হয়েছে।

বইটিতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও পিঠা-পুলির ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গৃহস্থালির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও স্থান পেয়েছে।

এ ছাড়া একটি বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে তৈরি করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলাই এর মূল দর্শন। প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক চর্চার বাইরে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখার পদ্ধতি এতে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠ্যবিষয়ের সংযোগ ঘটিয়ে শিখতে পারবে। শেখা যে কেবল মুখস্থ করা বা পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েও জ্ঞান অর্জন সম্ভব—সেই ধারণা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বইটি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভার কমানোর পাশাপাশি শিখনপ্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার সুযোগ তৈরি করবে।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি আটটি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা শুধু কী জানে, তা নয়—বাস্তবে কী করতে পারে, সেই সক্ষমতা বিকাশে বইটিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের সম্ভাবনা, উদ্ভাবন ও উৎপাদন, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাস্তব জীবনের কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়ক ব্যবহারে মৌলিক সমাধান খুঁজে বের করার ভিত্তি তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। নতুন চারটি বইয়েই শব্দকোষের মতো বিশেষ অংশ যুক্ত করা হয়েছে।

মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে শুরু হতে যাওয়া খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক পাঠক্রম পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও কারিগরি শিক্ষা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বাসসকে বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তক চালু হলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।