বাংলাদেশের পাঁচ খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০২:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
বাংলাদেশের মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ—এই পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।
টোকিওর জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার (জেট্রো) হলে মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয় সময় বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে মূল বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় জেট্রো ও জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
তারেক রহমান বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরির জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কম।
তিনি বলেন, সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে জাপান থেকে বাংলাদেশ ২১৬ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
এ সময় নিজের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফর ও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদানের কথা স্মরণ করেন তারেক রহমান।
তিনি জানান, চলতি বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের এটিই প্রথম এ ধরনের চুক্তি। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে।
বাংলাদেশের বাজার ও জনশক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮ কোটির বেশি মানুষের বাজার, ২৭ বছর মধ্যম বয়সের উদ্যমী তরুণ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের বড় সম্পদ। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটিতে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মোটরযান উৎপাদন
মোটরযান উৎপাদনকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, চলতি মাসের শুরুতে টয়োটা বাংলাদেশে একটি যানবাহন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি টয়োটাকে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জ্বালানি খাত
জ্বালানি খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানি কোম্পানিগুলো এসব পরিকল্পনার আওতায় বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে পারে। এ খাতে জেরা (জেইআরএ)-এর সঙ্গে বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা
প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্রিক একটি উদ্ভাবনমুখী তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মহাকাশ প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের মহাকাশবিষয়ক সক্ষমতা বাড়াতে মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধান করতে চায় বাংলাদেশ।
রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থা
রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরেকটি অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মহাপরিকল্পনা তৈরি, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ, রুটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ সহায়তা কামনা করেন তিনি।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ফসল, ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। এ খাতে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে জাপানি কোম্পানিগুলো।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তুলছে।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্ব
জাপানি কোম্পানিগুলোর উত্থাপিত উদ্বেগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্ক ছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়গুলো সরকার শুনেছে। এসব সমস্যার সমাধান এবং আরও ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দুটো নিশ্চিত করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব।
দক্ষতা উন্নয়ন ও জনসম্পর্ক
বাংলাদেশ ও জাপানের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জাপানে যান। পরে দেশে ফিরে তাঁরা অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।
তিনি জানান, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি লাখ লাখ তরুণকে জাপানি ভাষায় দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানি ভাষায় দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীরা দুই দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান পাশে ছিল। এখন বাংলাদেশের শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং যৌথভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জাপানি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করে দুই দেশের জনগণের জন্য পারস্পরিক সুযোগ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ফোরামে অন্যান্য বক্তা ও উদ্যোগ
সংলাপে বাংলাদেশ ও জাপানের ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন। তাঁরা বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিনজি ওয়াকায়ামা।
এ সময় সমঝোতা স্মারক বিনিময় এবং বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সহজতর করতে গৃহীত সংস্কার ও নতুন উদ্যোগ তুলে ধরেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি (এশিয়া প্যাসিফিক) প্রাইভেট লিমিটেডের ঢাকা শাখার শাখা মহাব্যবস্থাপক ও কান্ট্রি চেয়ারপারসন কেনিচিরো কাওয়ামোতো ‘টুগেদার ফর আ ব্রাইটার বাংলাদেশ’ শীর্ষক উপস্থাপনা দেন। ওয়াইকেকে করপোরেশনের গ্লোবাল সেলস হেডকোয়ার্টার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাত নিয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।