• ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৩ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পদ্মা-তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে নদীগুলো প্রাণবন্ত হবে: রিজভী

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ণ
পদ্মা-তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে নদীগুলো প্রাণবন্ত হবে: রিজভী
সংবাদটি শেয়ার করুন....

বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা, তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ানো গেলে নদীগুলো আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাও জোরদার করতে হবে।

রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জাতীয় পানিসম্পদ সুরক্ষায় পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ফারাক্কা থেকে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার পরিস্থিতিতে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা জরুরি। এভাবে পদ্মার শাখা-উপশাখাসহ অন্যান্য নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব হলে কৃষি সুরক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যাবে।

রিজভী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা ও তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এমনকি বর্ষাকালেও নদীগুলোর বিভিন্ন অংশে পানির স্বল্পতা দেখা যায়। তিস্তা ও যমুনা নদীর ওপর সেতু দিয়ে যাতায়াতের সময় নদীর মধ্যে চর দেখা যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পদ্মার শাখা ও উপনদীগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সমুদ্র থেকে আসা লবণাক্ত পানিকে ঠেলে ফিরিয়ে দেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন রিজভী। এতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ফারাক্কার প্রভাবে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলে গত ২০ থেকে ২৫ বছরে বৃষ্টিপাত ৩০ শতাংশ কমেছে। ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

ফারাক্কা চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে পানির হিস্যা নিশ্চিত করার জন্য গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, যা ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে বাদ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আরও জোরালো অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানির অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীর পানিবণ্টন নিয়েও বিরোধ রয়েছে। পানির হিস্যার প্রশ্নে কোনো পক্ষই সহজে ছাড় দিতে চায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ন্যায্য হিস্যা আদায়ে দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন।

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরিবেশগত প্রভাব তুলে ধরে রিজভী বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে আর্সেনিকের সমস্যা এবং পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপের কারণে পরিবেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, পানিবিজ্ঞানী বি. এম. আব্বাস তাঁর ‘গঙ্গেস ওয়াটার ডিসপিউট’ বইয়ে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া ব্রিটিশ আমলের প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্য পদ্মার ওপর বাঁধ নির্মাণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রিজভীর মতে, পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে জলাধার নির্মাণ করে বর্ষার পানি সংরক্ষণ এবং শাখা-উপনদীগুলোতে পানির প্রবাহ বজায় রাখা গেলে নদীগুলো আবারও সচল হবে। এতে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগের উন্নয়ন সম্ভব হবে। নদীকেন্দ্রিক বাংলার ঐতিহ্যবাহী সাম্পান ও পানসি নৌকার চলাচলও আবার দেখা যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গোলটেবিল বৈঠকের বিশেষ অতিথি আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার। একসময় এসব এলাকায় সব ধরনের ফসল উৎপাদিত হতো। কিন্তু বর্তমানে পানির সংকট ও নদীর পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলের মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। তিস্তাকে ঘিরে প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পদ্মা ব্যারাজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি, তিস্তা নদী সুরক্ষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশি প্রফেশনালস যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও সেলিম রেজা হাবিব।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ. কে. এম. শাহাবুদ্দিন, বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মো. আনোয়ার কাদির এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. রুহুল আমিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মেহেদী হাসান পলাশ।