১৪ লাখ কৃষকের ১,৩৫২ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ, স্বস্তি ফিরছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে
১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আসল-সুদসহ ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার | খেলাপির বোঝা থেকে মুক্তি, নতুন করে ব্যাংকঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়েছেন দেশের ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন প্রান্তিক কৃষক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদসহ মোট ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা মওকুফ করেছে। সরকারের এ উদ্যোগে স্বস্তি ফিরেছে প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে। একই সঙ্গে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও কৃষিপণ্যের বাজারদরের ওঠানামায় এমনিতেই চাপে থাকেন প্রান্তিক কৃষকেরা। এর মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হওয়ায় অনেকেই নতুন করে ব্যাংকঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। ঋণের দায় থেকে মুক্তি পাওয়ায় তাঁদের দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারের এ কর্মসূচির আওতায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহণকারী কৃষকদের মূল ঋণের পাশাপাশি জমে থাকা সম্পূর্ণ সুদ ও বকেয়া মওকুফ করা হয়েছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নেওয়া এ উদ্যোগকে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।
কৃষক বাঁচলে শক্তিশালী হবে খাদ্য নিরাপত্তা
কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে তিনি বলেন, সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় উপহার। এ উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, কৃষক বাঁচলে উৎপাদন বাড়বে, আর উৎপাদন বাড়লে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। কৃষকদের টেকসইভাবে স্বাবলম্বী করতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণের নিশ্চয়তা এবং ভর্তুকির ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
অধ্যাপক আবু আহমেদ আরও বলেন, দেশে খাদ্যসংকট দেখা দিলে বিদেশ থেকে বেশি দামে খাদ্য আমদানি করতে হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের সংকট তৈরি হলে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোও বেশি দামে খাদ্য বিক্রি করে। তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
তবে শুধু ঋণ মওকুফ করলেই কৃষকদের সব সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, অনেক কৃষকের ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার, ৩০ হাজার, ৫০ হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি। ফলে এ উদ্যোগ আর্থিক স্বস্তি দিলেও কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ঋণমুক্তির স্বস্তি যশোরের কৃষকদের মুখে
সরকারের ঋণ মওকুফের বাস্তব সুফল উঠে এসেছে যশোর সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষকের অভিজ্ঞতায়। দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায় থাকা এসব কৃষক এখন অনেকটাই স্বস্তিতে।
উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের নারাঙ্গলী গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন জানান, ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ায় দীর্ঘদিন দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি। ঋণ পরিশোধের জন্য বাড়ির গাছ কিংবা গোয়ালের গরু বিক্রির কথাও ভাবছিলেন। কিন্তু সরকার ঋণ মওকুফ করায় তাঁকে আর এসব সম্পদ বিক্রি করতে হয়নি।
ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমার মতো মানুষের ওপর থেকে বড় একটা বোঝা নেমে গেছে। বিপদের সম্বল বাড়ির গাছ, গরু কিছুই বিক্রি করতে হয়নি।’
একই উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়া গ্রামের কৃষক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ১০ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় দীর্ঘদিন চাপে ছিলেন তিনি। নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের পর ঋণ মওকুফ করায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন।
তাঁর ভাষায়, ‘আমার বিক্রি করার মতো কিছুই নেই। কোনোভাবেই এই ঋণ শোধ করতে পারতাম না। সরকার আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
এ ছাড়া চাঁচড়া ইউনিয়নের রূপদিয়া গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী এবং আরবপুর ইউনিয়নের মালঞ্চী গ্রামের কৃষক হায়দার আলীও ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ঋণ মওকুফ
সরকারের এ কর্মসূচির সিংহভাগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংকটি ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষকের ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ মওকুফ করেছে।
অন্যদিকে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছেন আরও ৭ লাখ ২৪ হাজার ৮০৩ জন কৃষক। তাঁদের অনুকূলে মওকুফ করা হয়েছে ৭৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে নির্ধারিত দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় ঋণ মওকুফ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সাধারণ কৃষকদের যাতে বাড়তি হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সরাসরি এ প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।
কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অথচ ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের তুলনায় কৃষি ও পল্লী খাতে ঋণ বিতরণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ২ দশমিক ২৩ শতাংশ। নিট ঋণ ও অগ্রিমের তুলনায় এ হার ছিল ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর নিট ঋণ ও অগ্রিমের ৪ শতাংশ এ খাতে বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী খাতে মোট ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। নির্ধারিত ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এ পরিমাণ বেশি। আগের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এ খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
নতুন ঋণপ্রবাহ বাড়ার প্রত্যাশা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে যেসব প্রান্তিক কৃষক নতুন করে ব্যাংকঋণ পাচ্ছিলেন না, ঋণ মওকুফের ফলে তাঁদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে মহাজনি ঋণ ও চড়া সুদের দাদন ব্যবসার ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে মওকুফ করা অর্থ পরিশোধ করায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও নতুন ঋণ বিতরণের সুযোগও বাড়তে পারে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থায়নের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ১৪ লাখের বেশি প্রান্তিক কৃষকের ঋণ মওকুফ সরকারের একটি বড় আর্থিক উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে নতুন ঋণ দেওয়া এবং কৃষি উপকরণের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার ওপর।