• ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১ নভেম্বর থেকে খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন-লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, আওতায় ফুটপাতের দোকানও

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
১ নভেম্বর থেকে খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন-লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, আওতায় ফুটপাতের দোকানও
সংবাদটি শেয়ার করুন....

খাদ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হচ্ছে ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’। নতুন এ বিধানের আওতায় রাস্তার পাশের খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও আমদানিকারকদেরও আসতে হবে। একই সঙ্গে শিশু, প্রবীণ এবং নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

গত ১৬ জুলাই সরকারি গেজেটে প্রকাশিত এ প্রবিধানমালার মূল লক্ষ্য জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। এর আওতায় নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার নিবন্ধন এবং বিশেষায়িত চার শ্রেণির খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি ও বিপণনের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. শফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর হলে অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নির্ধারণ এবং ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সহায়ক কাঠামো তৈরি হবে।

তিনি জানান, শুধু নিবন্ধন করলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এর মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায়ীদের একটি নির্দিষ্ট তালিকার আওতায় আনা, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, সচেতনতা বাড়ানো এবং খাদ্যজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির ঘটনায় দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা সহজ হবে।

ফুটপাতের খাবারের দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়

নতুন প্রবিধানমালার আওতায় রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী এবং মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন নিতে হবে।

শুধু বড় প্রতিষ্ঠান নয়, রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজুসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রেতাদেরও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি পাইকারি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার, কোল্ড স্টোরেজ, ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদন এবং খাদ্য সংযোজন দ্রব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত ব্যবসাও এ বিধানের আওতায় আসবে।

বিএফএসএর মতে, নিবন্ধনের মাধ্যমে দেশের কোথায় কারা খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করছেন, সে সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে অনিয়ম শনাক্ত, অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।

শিশু ও রোগীদের বিশেষ খাদ্যে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক

নতুন বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্যপণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ অনুরূপ খাদ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি ও বিপণনে লাইসেন্স নিতে হবে।

এ ছাড়া বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য এবং স্বাস্থ্য সহায়ক বা রোগের ঝুঁকি হ্রাসের দাবি-সংবলিত খাদ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুল কাদের বাসসকে বলেন, শিশু ও প্রবীণদের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ এবং প্রবীণদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে এসব পণ্যের ভূমিকা রয়েছে।

তিনি বলেন, নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানকে বিধি অনুযায়ী লাইসেন্সের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তবে শিশু ও প্রবীণদের সব ধরনের খাদ্যপণ্য একইভাবে লাইসেন্সের আওতাভুক্ত নয়। সংশ্লিষ্ট পণ্যের শ্রেণি ও বিধিমালায় নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী নিবন্ধন বা লাইসেন্স প্রযোজ্য হবে।

পণ্যের প্যাকেটে থাকবে বিএফএসএর নিবন্ধন নম্বর

নতুন বিধান অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের মোড়কে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হবে। এর ফলে ভোক্তারা পণ্যের প্যাকেট থেকেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য শনাক্ত করতে পারবেন। কোনো অনিয়ম বা অভিযোগের ক্ষেত্রেও এ নম্বর ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে নিবন্ধন নম্বর থাকলেই কোনো খাদ্যপণ্য নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। পণ্যের মান, উপাদান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং সংরক্ষণব্যবস্থার যথাযথ তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।

নিবন্ধন বিনামূল্যে, লাইসেন্স ফি সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা

বিএফএসএর তথ্য অনুযায়ী, বিধিমালার তফসিল-১০ অনুসারে নির্ধারিত ফি পরিশোধ ও শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে হবে। নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরম ৫.১ এবং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফরম ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১ ব্যবহার করতে হবে।

প্রাথমিকভাবে কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে। পর্যায়ক্রমে শতভাগ অনলাইন আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে করা হবে। অন্যদিকে, বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রিমিসেস লাইসেন্সের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের আয়তন অনুযায়ী। ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য ফি ১০ হাজার টাকা। আর ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ফি ৬০ হাজার টাকা।

নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হলে তা নবায়ন করতে হবে।

নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করলে আইনি ব্যবস্থা

নির্ধারিত ক্ষেত্রে নিবন্ধন বা লাইসেন্স ছাড়া খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে ১ নভেম্বর থেকে নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইন অনুযায়ী নিবন্ধন বা লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে।

তবে নতুন বিধিমালার কার্যকারিতা নিয়ে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও ভ্রাম্যমাণ খাদ্য ব্যবসায়ীদের কাছে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া, আবেদনসংক্রান্ত জটিলতা দূর করা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বিএফএসএর চেয়ারম্যান জানান, নিবন্ধিত খাদ্য ব্যবসায়ীদের সরাসরি ও ডিজিটাল—উভয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাবার তৈরি ও পরিবেশন এবং খাদ্য সংরক্ষণের বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা দেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে নতুন এ বিধিমালার মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন, লাইসেন্সিং ও জবাবদিহির একটি কাঠামো তৈরি হতে যাচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, নিয়মিত পরিদর্শন, অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ভোক্তাদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে তবেই নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে।