ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পরিচ্ছন্ন ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ার কাজ এখন থেকেই শুরু করতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিচ্ছন্ন পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরে তরুণদের নিজেদের পাশাপাশি বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে বলেছেন তিনি।
শনিবার রাজধানীর মিরপুর বাংলা কলেজ পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য জানান।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ আয়তনের তুলনায় অত্যন্ত জনবহুল দেশ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। এত মানুষের শহর পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হলেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তরুণেরা দ্রুত কোনো এলাকা পরিষ্কার করতে পারেন। তবে এ কাজ শুধু নির্দিষ্ট কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও সচেতন করতে হবে।
পরিচ্ছন্ন পরিবেশের সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের সম্পর্ক তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার থাকলে পরিবারের সদস্যদের সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। বিপরীতে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি বলেন, ‘এত বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে সবাইকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধের ব্যবস্থা করা কঠিন। তাই আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে মানুষকে সুস্থ রাখা। আর মানুষকে সুস্থ রাখতে হলে পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিবছর ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এ রোগ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তারেক রহমান জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাসাবাড়ি, স্কুল-কলেজ, কর্মস্থল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
রাস্তা, খাল, নদী ও জলাশয়ে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্জ্য জমে পরিবেশ দূষিত হয় এবং রোগজীবাণু ও মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ রাস্তায় ময়লা ফেললে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে তাকে সহযোগিতা করবে, যাতে ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয়। মনে রাখতে হবে, তোমরা শুধু নিজের জন্য নয়, সবার স্বার্থে কাজ করছো।’
বায়ুদূষণ কমাতে বেশি করে গাছ লাগানোর আহ্বান
রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান প্রায়ই ওপরের দিকে থাকে, যা অত্যন্ত বিব্রতকর। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বেশি করে গাছ লাগাতে হবে।
বৃক্ষরোপণে নিজের অতীত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠনের মাধ্যমে ২০০৪-০৫ সালের দিকে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৮০ হাজার নিমগাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন তোমাদের আমাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। তোমরা আরও বেশি গাছ লাগাবে। ইনশাআল্লাহ, তোমরা পারবে।’
এ সময় সৌদি আরবের আরাফাতের ময়দানে নিমগাছ রোপণের ইতিহাসও তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসময় আরাফাতের ময়দান প্রায় বৃক্ষশূন্য ছিল। পরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেখানে নিমগাছের চারা পাঠান। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের পরামর্শে সৌদি আরবের আবহাওয়ার উপযোগী গাছ হিসেবে নিম নির্বাচন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে নিমগাছের বিস্তার ঘটে এবং গাছটি ‘জিয়া ট্রি’ নামে পরিচিতি পায়।
পরিচ্ছন্নতায় অভ্যাস পরিবর্তনের ওপর জোর
পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে জাপানের উদাহরণ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, দেশটির রাস্তাঘাটে খুব কম ময়লা-আবর্জনা দেখা যায়। এর পেছনে শুধু পরিষ্কার করার ব্যবস্থা নয়, মানুষের ময়লা না ফেলার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ ও পানিদূষণ রোধে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। যত্রতত্র প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। ভবিষ্যৎ তোমাদের। এই দেশ তোমরাই পরিচালনা করবে।’
এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে শনিবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনে আকস্মিক পরিদর্শনে বের হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর অংশ হিসেবে তিনি মিরপুর বাংলা কলেজ পরিদর্শন করেন।