ভূমিকম্পে ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা, আগাম প্রস্তুতির তাগিদ রাষ্ট্রপতির
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা; দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা ও দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো গড়ার আহ্বান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
যেকোনো ধরনের দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি এবং যথাযথ নগর পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নিয়েও আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ঢাকা শহরের দিকে তাকালে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয় ভূমিকম্পকে ঘিরে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে শহরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা না থাকলে দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তাই বাড়িঘর নির্মাণ, নগর ব্যবস্থাপনা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং নদীদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
কাঠমান্ডু ও তেহরানের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি বলেন, পরিকল্পিত ব্যবস্থা না থাকলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের দুর্যোগঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, ভূমিধস, খরা, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পের মতো নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে আসছে। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, ওই দুর্যোগ প্রমাণ করে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় একটি রাষ্ট্র ও তার জনগণের জন্য কতটা ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে দুর্যোগ এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য হলেও এর বিরূপ প্রভাবের বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে দেশটি অন্যতম। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে দুর্যোগে প্রাণহানি কমেছে। পাশাপাশি উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাও বেড়েছে।
তবে শুধু আগাম সতর্কবার্তা দিলেই চলবে না, দুর্যোগের আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, আগাম সতর্কীকরণ থেকে আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং দুর্যোগের পর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের সমস্যার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁদের বিষয়ে এখনো কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পসহ দেশের বিভিন্ন দুর্যোগঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশদূষণ রোধ, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানির প্রবাহ ব্যবস্থাপনার জন্য খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। বর্তমান সরকারও এ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব কর্মসূচি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের প্রস্তুতির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি সিলেটের হাওর অঞ্চলের মানুষের আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের উদ্যোগের প্রশংসা করেন তিনি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের ঘরবাড়ি নিরাপদ করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের দুর্যোগ প্রস্তুতির আওতায় আনতে হবে। জরুরি কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদে রাখতে হবে এবং সরকারের আগাম সতর্কবার্তায় দ্রুত সাড়া দিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, নদী-খাল রক্ষা ও বৃক্ষরোপণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার প্রায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এ উদ্যোগ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্যোগসহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সহনশীলতার সূচনা হোক ঘর থেকে। আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলি এবং দুর্যোগসহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’
এর আগে সকাল ১০টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে স্থাপিত বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন রাষ্ট্রপতি। পরে বক্তব্যের আগে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল আলম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান। এর আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনবিষয়ক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।