• ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতি মামলার আসামি বাচ্চু মিয়াকে গাজীপুর প্রকল্পের শীর্ষ পদে নিয়োগ, নিয়ম ভেঙে এলজিইডির ‘গোপন’ আদেশ

মন্ত্রণালয়ের বাছাই কমিটির অসম্মতি উপেক্ষা করে প্রশাসনিক ফাঁকফোকরে নিয়োগ; দুর্নীতির মামলায় জড়িত আসামির বিরুদ্ধে কোটি  টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইতিমধ্যে দুদকের মামলা চলমান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত জুলাই ১৬, ২০২৬, ১৯:৫২ অপরাহ্ণ
দুর্নীতি মামলার আসামি বাচ্চু মিয়াকে গাজীপুর প্রকল্পের শীর্ষ পদে নিয়োগ, নিয়ম ভেঙে এলজিইডির ‘গোপন’ আদেশ
সংবাদটি শেয়ার করুন....

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)  মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালা অমান্য করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার এক আসামিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি উন্নয়ন প্রকল্পের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডির ঢাকা জেলার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়াকে ‘গাজীপুর জেলা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ প্রদান করা হয়েছে—যদিও একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।

মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক বাছাই কমিটির স্পষ্ট অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও গত ২২ জুন একটি অভ্যন্তরীণ অফিস আদেশের মাধ্যমে এই বিতর্কিত নিয়োগ দেওয়া হয়, যা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দায়ের করা ৩৬ নম্বর মামলার (দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা) নথি অনুযায়ী, আসামিরা হলেন—

১. মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী, এলজিইডি, জেলা-ঢাকা; ২. মো. ছাবের আলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, এলজিইডি, ঢাকা; ৩. মো. শামস জাভেদ, উপ-সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, এলজিইডি, ঢাকা; ৪. আবু সাইদ খান, স্বত্বাধিকারী, মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলী (ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান)।

এজাহারে বলা হয়েছে, রাজধানীর মিরপুরের গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ কাজ (“Establishment and Infrastructure Development including Beautification of Govt. Primary School in Dhaka city and Purbachol” প্রকল্পের আওতায়, প্যাকেজ নম্বর e-tender/DCGPS/WD-01/2023-24/49) সম্পন্ন না হতেই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঠিকাদারকে সরকারি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। ৫ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৪৯০ টাকা চুক্তিমূল্যের এই প্রকল্পে ভবনের ৩য় ফ্লোর (৪র্থ তলা) ও ৪র্থ ফ্লোরের (৫ম তলা) সুপারস্ট্রাকচার নির্মাণকাজ প্রকৃতপক্ষে সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও মেজারমেন্ট বুকে (এমবি বুক) ভুয়া তথ্য লিপিবদ্ধ করে ওই কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল মঞ্জুর ও উত্তোলন করা হয়। এর ফলে সরকারের প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৬ টাকা অতিরিক্ত/ভুয়া বিল পরিশোধের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের অভিযান ও সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে এই অনিয়ম উদঘাটিত হয়। ঘটনার সময়কাল হিসেবে ১৫ মে থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময় উল্লেখ করা হয়েছে।

এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বাচ্চু মিয়াকে তাঁর দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে এলজিইডি সদর দপ্তরে  সংযুক্ত করা হয় এবং বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সদর দপ্তরের সংযুক্ত থাকা অবস্থাতেও একটি আকর্ষণীয় পোস্টিংয়ের জন্য জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছিলেন বাচ্চু মিয়া। প্রায় তিন মাস আগে  স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বাচ্চু মিয়াকে গাজীপুর প্রকল্পের নিয়মিত পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে দুদকের সচল মামলা থাকার কারণে মন্ত্রণালয়ের বাছাই কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে তাঁর নাম নাকচ করে দেয়। এরপরও দমে না গিয়ে এলজিইডি আবারও তাঁর নাম সুপারিশ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মন্ত্রণালয়ে একটি মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

সাক্ষাৎকার বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য জানান, বাচ্চু মিয়ার নাম বারবার সুপারিশ করায় কমিটির সদস্যরা গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, দুদকের মামলার আসামি কোনো কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে খালাস না পাওয়া পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার কোনো প্রকল্পের প্রধান করা যাবে না। ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

বাচ্চু মিয়ার জন্য নিয়মিত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হয়ে তারা একটি প্রশাসনিক ফাঁকফোকর বেছে নেন। তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে  গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে একটি অভ্যন্তরীণ অফিস আদেশ জারি করেন, যার মাধ্যমে বাচ্চু মিয়াকে প্রকল্প পরিচালকের পদের ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দেওয়া হয়। এই কৌশলের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়—কারণ নিয়মিত পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’-এর বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন।

এই দুর্নীতি মামলার সাথে জড়িত বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার চেষ্টা এলজিইডি প্রশাসনের এবারই প্রথম নয়। এর আগে বাচ্চু মিয়ার সহ-আসামি (২) মো. সাবের আলীকে ময়মনসিংহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল। এ নিয়ে জাতীয় পত্রিকায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। প্রধানমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করার নির্দেশ দেন, যার ফলে কর্তৃপক্ষ সাবের আলীর বদলি আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয়।

সংশ্লিষ্ট মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গোপনে একই দুদক মামলার প্রধান আসামির হাতে একটি উন্নয়ন প্রকল্প তুলে দিয়েছেন, যা প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর তদারকির প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল বলে মনে করছেন তাঁরা।

এই বিতর্কিত নিয়োগের বিষয়ে এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল বারেক এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটি আদেশ হয়েছে বলে তিনি জানেন, তবে এ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করার কিছু নেই। তিনি আরও বলেন, এটি একটি স্থানীয় (লোকাল) আদেশ এবং মন্ত্রণালয় যেকোনো সময় তা বাতিল করতে পারে। পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রনালয়ের সিদ্ধান্তেই চুড়ান্ত।