নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নে ২৫ কোটি ইউরোর অর্থায়ন, বৈশ্বিক অংশীদারত্বের আহ্বান জুবাইদার
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১২, ২০২৬, ২৩:২৬ অপরাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
বাংলাদেশে নারীস্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান। বার্লিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে তিনি জানান, নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ২৫ কোটি ইউরোর ঋণ নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ব্যবহারের বিষয়ে চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। নারীস্বাস্থ্য খাতে টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়ন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেনস হেলথ বিয়ন্ড এইড’-এ বক্তব্য দেন ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে উদ্ভাবনী অর্থায়ন, জাতীয় পর্যায়ে অঙ্গীকার, সহজ শর্তে বিনিয়োগ, অনুদানভিত্তিক কারিগরি সহায়তা এবং টেকসই অভ্যন্তরীণ সম্পদের সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, উদ্ভাবনী অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সমন্বয়ে বাংলাদেশ নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়নে কার্যকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। এ জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
নারীস্বাস্থ্য খাতে খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্বল্পমেয়াদি সহায়তার বদলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন ডা. জুবাইদা। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপান্তর করাও জরুরি।
তিনি বলেন, নারীস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ কেবল স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় নয়; এটি মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জাতির ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী হওয়ায় দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারীস্বাস্থ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।
নারীস্বাস্থ্য ও সরকারের পরিকল্পনা
বর্তমান সরকার নারীস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, প্রচলিত মাতৃস্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা, মাতৃ অপুষ্টি, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু এবং নারীদের আক্রান্তকারী প্রাণঘাতী ক্যানসার মোকাবিলায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার মতো সরকারের উদ্যোগ নারী ও মেয়েদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করছে।
মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে এক লাখ কমিউনিটি ও ওয়েলবিইং কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব কর্মীর প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। পাশাপাশি আরও ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
ডা. জুবাইদা বলেন, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসব উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা হস্তক্ষেপ কমানো এবং প্রত্যেক নারীর জন্য দক্ষ ও সহানুভূতিশীল মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো নারীকে প্রয়োজনীয় ও সমন্বিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা পেতে নিজের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা হাসপাতালের বাইরে যেতে হওয়া উচিত নয়। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কোনো নারীর জীবন বাঁচানো ঢাকা পর্যন্ত যাতায়াতের সামর্থ্য কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য নয়; এটি সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার।
নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে পূর্ববর্তী উদ্যোগের উল্লেখ
বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে অবদানের কথা তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা রহমান।
তিনি বলেন, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনগণের অংশগ্রহণ এবং পরিবার পরিকল্পনার ওপর জিয়াউর রহমানের গুরুত্বারোপ সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে, বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগ বহু প্রজন্মের তরুণীর সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
নারীদের আক্রান্তকারী ক্যানসারে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশের নতুন নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে অংশীদারত্বের জন্য জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
ডা. জুবাইদা বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ের নিরাপদ শৈশব, প্রতিটি মায়ের নিরাপদে সন্তান জন্ম দেওয়ার অধিকার এবং গ্রাম ও শহরের প্রতিটি নারীর দীর্ঘ ও উৎপাদনশীল জীবনযাপনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ওই অধিবেশনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. জুবাইদা রহমান। এতে সরকার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা প্রচলিত সহায়তার বাইরে নারীস্বাস্থ্য খাতে নতুন অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
অধিবেশনে ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কেইতা, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিনতাহ আকানদোহ, ইআইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা, জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয়ের বির্গিট পিকেল এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল টেকসই স্বাস্থ্য অর্থায়ন ও মিডওয়াইফারি খাতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়। নারীস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা বাড়াতে বায়ার, রোশে, বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং শারিতে-ইউনিভার্সিটেটসমেডিজিন বার্লিনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করে প্রতিনিধিদল।
নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ২৫ কোটি ইউরোর ঋণ পুনর্বিন্যাস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ২৫ কোটি ইউরোর একটি সার্বভৌম ঋণ নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ব্যবহারের জন্য পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগের আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করবে ইউএনএফপিএ।