• ৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় সফল হলেও ইরানে যেভাবে কবর রচিত হয়েছিল মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত জানুয়ারি ৮, ২০২৬, ১৭:০৮ অপরাহ্ণ
ভেনেজুয়েলায় সফল হলেও ইরানে যেভাবে কবর রচিত হয়েছিল মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের!
সংবাদটি শেয়ার করুন....

গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’ চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো কৌশলে ভেনেজুয়েলার সুরক্ষিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের নিউ ইয়র্কে হাজির করে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

এই অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিটটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অভিজাত ও ভয়ংকর কমান্ডো বাহিনী হিসেবে পরিচিত ডেল্টা ফোর্স। মাত্র ২০ মিনিটের অভিযানে তারা মাদুরোকে তার নিজ বাসভবনের শোবার ঘর থেকেই আটক করতে সক্ষম হয়। এই অভাবনীয় সফলতার ফলে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে ডেল্টা ফোর্স।

তবে ইতিহাস বলছে, এই ডেল্টা ফোর্সই একসময় ভয়াবহ ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিল ইরানের মরুভূমিতে।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয় বিপ্লবী ছাত্ররা। ওই ঘটনায় ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও দূতাবাসকর্মী জিম্মি হন। দীর্ঘ সময় কূটনৈতিক চেষ্টা করেও তাদের মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের ওপর রাজনৈতিক ও জনমতের চাপ চরমে পৌঁছায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৮০ সালে সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন প্রেসিডেন্ট কার্টার। এই গোপন অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’। অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডেল্টা ফোর্সকে, যার নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল চার্লি বেকউইথ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, হেলিকপ্টার ও সি-১৩০ পরিবহন বিমানের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে প্রবেশ করে একটি নির্দিষ্ট মরুভূমি এলাকায় মিলিত হওয়ার কথা ছিল বাহিনীর। সেখান থেকে পরদিন রাতে তেহরানে গিয়ে বন্দিদের উদ্ধার করার পরিকল্পনা করা হয়।

১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিল রাতে অভিযান শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস নিমিটজ থেকে উড্ডয়ন করে আটটি আরএইচ-৫৩ডি হেলিকপ্টার। কিন্তু পথে ভয়াবহ বালুঝড় বা ‘হাবুব’-এর মুখে পড়ে একাধিক হেলিকপ্টার যান্ত্রিক সমস্যায় পড়ে। নির্ধারিত আটটির মধ্যে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টার কার্যকর রাখা সম্ভব হয়নি।

প্রতিকূল আবহাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি ও সময়সূচির মারাত্মক ব্যত্যয়ের কারণে অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু প্রত্যাহারের সময় ঘটে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি হেলিকপ্টার জ্বালানিবাহী সি-১৩০ বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে। এতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুনে পুড়ে যায় উভয় আকাশযান।

এই দুর্ঘটনায় পাঁচজন বিমানবাহিনী সদস্য ও তিনজন মেরিনসহ মোট আটজন মার্কিন সেনা নিহত হন। পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে নিহতদের মরদেহ ও বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ঘটনাস্থলেই ফেলে রেখে বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়।

এই ব্যর্থ অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’-এর ব্যর্থতা ১৯৮০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিমি কার্টারের পরাজয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এই ঘটনাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগ্রাসনের শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ইরানের ভূখণ্ডে হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল।

সামরিক দিক থেকে এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে বিশেষ অভিযান ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার আনা হয় এবং গঠন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড।

দীর্ঘ ৪৪৪ দিন পর, ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের শপথ গ্রহণের দিন জিম্মিরা মুক্তি পান। ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ আজও সামরিক ইতিহাসে একটি ব্যর্থ কিন্তু শিক্ষণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
সূত্র: তেহরান টাইমস

আরো পড়ুন

দৈনিক ভোর
×
Loading...