• ১৩ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৮শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে ৪ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ৯, ২০২৬, ১৫:২৮ অপরাহ্ণ
তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে ৪ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন
সংবাদটি শেয়ার করুন....

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দিতে চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করেছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে একজন অপারেটর নির্বাচন করা হবে, যারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি যাত্রীসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

মনোনীত চার প্রতিষ্ঠান হলো যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এমিরেটস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডানাটা। বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বাসসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বেবিচকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে—এমন কোনো নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক বা অন্যান্য উদ্বেগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করবে কর্তৃপক্ষ।

বেবিচকের ছাড়পত্র পাওয়ার পর জাপানি কনসোর্টিয়াম যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে একটি নির্বাচন করবে। এরপর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের নামে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং লাইসেন্স ইস্যু করবে বেবিচক। এর মাধ্যমে তৃতীয় টার্মিনালে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নির্বাচিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি কাজ করবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব একচেটিয়াভাবে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির কাছেই থাকবে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যে রয়েছে উড়োজাহাজের সেবা কার্যক্রম, যাত্রীদের চেক-ইন, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, উড়োজাহাজের পাশে পরিচালন কার্যক্রম এবং উড্ডয়নের আগে উড়োজাহাজ প্রস্তুত করার কাজ। এসব কার্যক্রমের ওপর সেবার মান, সময়ানুবর্তিতা ও যাত্রীদের অভিজ্ঞতা অনেকাংশে নির্ভর করে।

শিল্প খাতের বিশ্লেষকদের মতে, চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে অপারেটর নির্বাচনের বিষয়টি শুধু নতুন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের পর আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তুতিও এগোচ্ছে।

যাত্রীদের জন্য ব্যাগেজ সরবরাহের সময়, চেক-ইনের দক্ষতা, যাত্রীদের সহায়তা এবং সেবা বিঘ্নিত হলে তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা হবে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অন্যদিকে এয়ারলাইনসগুলোর জন্য নিরাপদ উড়োজাহাজ পরিচালনা, দ্রুত টার্ন অ্যারাউন্ড, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের প্রাপ্যতা এবং ফ্লাইটের সময়সূচি বজায় রাখার সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

চার প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

বাসসের পর্যালোচনা করা শিল্প খাতের তুলনামূলক তথ্যে দেখা গেছে, মেনজিস ৬৫টি দেশের ৩৪৭টি বিমানবন্দরে, সুইসপোর্ট প্রায় ৪৪ থেকে ৪৯টি দেশের প্রায় ৩১০টি বিমানবন্দরে, ডানাটা ৩৫টি দেশের ১৪৬টি বিমানবন্দর বা স্থানে এবং সেলেবি পাঁচটি দেশের ৬০টির বেশি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

তুলনামূলক তথ্যে মেনজিসের কর্মীর সংখ্যা ৬৫ হাজারের বেশি, সুইসপোর্টের প্রায় ৪৩ হাজার, ডানাটার ৫৫ হাজারের বেশি এবং সেলেবির প্রায় ৯ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মেনজিস বছরে প্রায় ৫৩ লাখ ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করে। সুইসপোর্টের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা বছরে প্রায় ৪০ লাখ ফ্লাইট। অন্যদিকে, ডানাটা বছরে ৮ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড কার্যক্রম পরিচালনা করে।

কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে সুইসপোর্ট বছরে প্রায় ৬২ লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনা করে, যা ডানাটার ৩২ লাখ টন এবং মেনজিসের ২৪ লাখ টনের চেয়ে বেশি। এসব পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন পরিচালন ক্ষেত্রে সক্ষমতার পার্থক্য তুলে ধরে।

শিল্প খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, ঢাকার বিমানবন্দরে মূল চ্যালেঞ্জ হবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে বাস্তব সেবার উন্নয়নে রূপান্তর করা।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা মেনজিসের

বাংলাদেশে মেনজিসের প্রস্তাবটি বিশেষ মনোযোগ পেয়েছে। কারণ, এতে স্থানীয় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচিত হলে প্রথম বছরেই ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এ অর্থ গ্রাউন্ড সাপোর্ট সরঞ্জাম, বিমান চলাচল প্রযুক্তি, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এসব কর্মীর প্রায় ৯৯ শতাংশ বাংলাদেশি হবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আনুমানিক সাড়ে চার হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।

মেনজিস বিমানবন্দর এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া পেশাগত প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও কর্মজীবনের সুযোগ তৈরিতে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিমান চলাচলবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

বেবিচক পরিমাপযোগ্য সেবার মানদণ্ড চালুর দিকে এগোচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রথম ব্যাগেজ প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে এবং সব ব্যাগেজ প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

গত মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় মেনজিসের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস ওয়াইলি বলেন, ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ থেকে প্রথম ব্যাগেজ ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে এবং সর্বশেষ ব্যাগেজ ৪০ মিনিটের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

তিনি জানান, প্রস্তাবিত কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল ব্যাগেজ সমন্বয় এবং কার্যসম্পাদন মূল্যায়নব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে।

দ্রুত উড়োজাহাজ প্রস্তুত করাও গুরুত্বপূর্ণ

উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড বা পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত করার প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাগেজ খালাস, অন্যান্য সেবা, র‌্যাম্প সমন্বয় কিংবা নতুন করে ব্যাগেজ তোলার কাজে বিলম্ব হলে ফ্লাইটের সময়সূচিতে প্রভাব পড়তে পারে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক বিমান চলাচলকেন্দ্রে উন্নীত করতে হলে উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড কার্যক্রমে ধারাবাহিক দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের উন্নত সুযোগ-সুবিধার সর্বোচ্চ সুফল পেতে অভিজ্ঞ অপারেটর প্রয়োজন হবে।

তিনি বলেন, স্থাপন করা সরঞ্জামগুলো অত্যাধুনিক এবং সেগুলো পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান দরকার। আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা জ্ঞান বিনিময়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে দক্ষ পেশাজীবীর সংখ্যা বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে।

বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো দীর্ঘদিন ধরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় আরও প্রতিযোগিতা চালুর পক্ষে মত দিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, প্রতিযোগিতার ফলে সেবার মান বাড়তে পারে এবং ব্যাগেজ সরবরাহ ও উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ডের সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।

যাত্রীসেবায় প্রতিযোগিতা চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন মফিদুর রহমান।

বিমান চলাচল খাতের উদ্যোক্তা ও টিএএস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অপারেটররা স্থানীয় কর্মীদের কাছে জ্ঞান হস্তান্তরের পাশাপাশি দক্ষতা, নিরাপত্তা, বিধিবিধান অনুসরণ এবং সেবার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন।

তিনি বলেন, মালিকানা সরকারের হাতে রেখেও পরিচালনার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর ওপর দেওয়া যেতে পারে।

নির্বাচনের পর কার্যক্রম মূল্যায়নে থাকবে সেবার মান

শিল্প খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা চারটি প্রতিষ্ঠানেরই উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। সুইসপোর্টের বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেটওয়ার্ক এবং কার্গো ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। ডানাটা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে এমিরেটস গ্রুপের বৃহত্তর বিমান চলাচল ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়েছে। সেলেবিরও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অন্যদিকে, সরবরাহ করা তুলনামূলক তথ্যে মেনজিসের কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি দেশে বিস্তৃত এবং এর বিমানবন্দর নেটওয়ার্কও বড়। পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা রয়েছে।

বিমান চলাচল বিশ্লেষক এ টি এম নজরুল বলেন, শেষ পর্যন্ত যে প্রতিষ্ঠানই নির্বাচিত হোক, তার কার্যক্রম মূল্যায়নে ব্যাগেজ সরবরাহ, উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড, সরঞ্জামের প্রাপ্যতা, নিরাপত্তা, কর্মীদের দক্ষতা এবং যাত্রীসেবার মতো বিষয়ে সুস্পষ্ট মূল কর্মসম্পাদন সূচক থাকা প্রয়োজন।

নতুন অপারেটরটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি কাজ করায় একই টার্মিনালে দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যসম্পাদন তুলনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে এবং তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত এক হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে।

জাপানি কনসোর্টিয়ামটি গঠিত হয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি লিমিটেড, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশনকে নিয়ে।

চুক্তিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর কনসোর্টিয়ামটি তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আগে যাত্রীসেবা প্রদানকারী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ হবে পরিচালনাগত প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।